ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইএফআইসি ব্যাংক বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা তুলে নেন তিনি। শুধু নিজে নন, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের সুযোগ করে দেন তিনি। সেসব ঋণ ওই সময় খেলাপি হলেও নিয়মিত দেখানো হয়েছে, যার কারণে ব্যাংক সংকটে থাকলেও বোঝার উপায় ছিল না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার গণআন্দোনলে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে নিয়ন্ত্রণ হারান সালমান এফ রহমান। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহমুদ হোসেনকে চেয়ারম্যান করে ছয় সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দেওয়া হয়। নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শে ব্যাংকের গোপন খেলাপি ঋণ বের করে আনা হয়। এরপরই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়।
নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার দুবছরে আমানতে কিছুটা উন্নতি হলেও ব্যাংকের মূল সংকট কিন্তু কাটেনি। বরং খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও লোকসান থেকে বের হওয়া যায়নি। এ সময় আইএফআইসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, নীতিমালা লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক বিশেষ পরিদর্শনে এসব অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ উদ্ঘাটন হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরপরই। এরপর ব্যাংকের দায়িত্ব ছিল খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি অন্যান্য আর্থিক সূচক উন্নতি করা। কিন্তু ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক অবস্থায় উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতি বোর্ড এবং চেয়ারম্যানের নেতৃত্বের ব্যর্থতারই প্রমাণ। আর্থিক সূচকগুলোর অবনতি, সুশাসনের ঘাটতি এবং অনিয়ম রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে ব্যাংকটিতে।
জানা গেছে, অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে আইএফআইসি ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ এখন আর ফিরে আসছে না। নতুন পর্ষদও ঋণ আদায়ে খুব একটা অগ্রগতি দেখাতে পারছে না। এ কারণে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে।
২০২৪ সালের জুন শেষে আইএফআইসি ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৪৩ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩,৭৫৬ কোটি টাকা খেলাপি ছিল, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৮.৭২ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ শেষে ঋণ ছিল ৪৫ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকার ঋণ ছিল খেলাপির খাতায়, যা বিতরণকৃত ঋণের ৬৩.৪৬ শতাংশ। খেলাপি ঋণ উদ্ঘাটনের পর সর্বোচ্চ ছিল ২৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বা ৬১.৪৭ শতাংশ। এরপর খেলাপি ঋণ কমার কথা থাকলেও বরং বাড়ছে। গত জুন শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আরো বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা বা ৬৩.৩৮ শতাংশ।
ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, খেলাপি হওয়া এসব ঋণের মধ্যে আওয়ামী লীগ আমলে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা অস্তিত্বহীন বিভিন্ন কোম্পানির নামে বিতরণ করা হয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে তেমন কোনো জামানতও ব্যাংকের কাছে জমা নেই। এগুলো মূলত সালমান এফ রহমানের ‘বেনামি কোম্পানি’ বলে চিহ্নিত করা হয়।
কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকটি থেকে যেসব ব্যক্তি ঋণ নিয়েছেন, তাদের অধিকাংশ জেলে বা পলাতক। যার ফলে খেলাপি ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না।
অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ফলে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণেও হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংক। তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জুন শেষে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের জুন শেষে ছিল ৫০৫ কোটি টাকা। প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে আইএফআইসি ব্যাংক।
জানা গেছে, গত মার্চ শেষে ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে উদ্বৃত্ত ছিল ২৬৭ কোটি টাকা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি কমানোর বিষয়ে ব্যাংকের কাছে কর্মপরিকল্পনা চেয়েছে। ব্যাংক এই ঘাটতি কমাতে ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েছে।
জানা গেছে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, প্রভিশন ও মূলধন ঘটতি এবং সুদ থেকে আয় না হওয়ায় ব্যাংক বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ১,৬৬৮ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান দিয়েছে ব্যাংকটি। এর ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে বছর শেষে আইএফআইসির নিট লোকসান গত বছরকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি ২,৫৬২ কোটি টাকা নিট লোকসান গুনেছে। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে ব্যাংকের লাভ ছিল ৬৩ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, যেসব ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তাদের শিগগির মূল্যায়ন করা হবে। মূল্যায়নের পরই পর্ষদ থাকবে কি না, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইএফআইসির চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও ব্যাংকের আর্থিক সূচকে অবনতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ব্যাংকের মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। এ বিষয়ে ব্যাংকের মুখপাত্র হেলাল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

