সুদহার ১০ শতাংশই বহাল

বেসরকারি ঋণে লাগাম নতুন মুদ্রানীতিতে

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

বেসরকারি ঋণে লাগাম নতুন মুদ্রানীতিতে

মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না নামায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বহাল রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে নীতি সুদহার বা পলিসি রেট ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এ সময় উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান। অনুষ্ঠানে তিন ডেপুটি গভর্নর, প্রধান অর্থনীতিবিদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানির মূল্য সমন্বয়, আকস্মিক বন্যায় কৃষি উৎপাদনের ক্ষতি এবং ইরানযুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার বেড়েছে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশেই বহাল রাখা হয়েছে।

আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরবরাহব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) বিঘ্ন, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি এবং ২০২৪ সালের মাঝামাঝি শুরু হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবের কারণে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুরো সময়জুড়ে মন্থর ছিল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের প্রকৃত (রিয়েল) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ফলে অর্থনীতিতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিললেও প্রবৃদ্ধি এখনো তুলনামূলক দুর্বল।

আগের মুদ্রানীতিতে চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু গত মে মাস পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ডিসেম্বরের জন্য এ লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে সরকারি খাতের ঋণের লক্ষ্য জুন পর্যন্ত ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ ধরা হলেও বাস্তবে তা বেড়ে ২৫ দশমিক ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। সরকারের রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত না হওয়ায় ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২১ দশমিক ৮০ শতাংশ।

ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়ক পদক্ষেপের ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে বাড়বে। এতে অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আট শতাংশে উন্নীত হতে পারে। একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

কমবে অর্থ সরবরাহ

গত জুন পর্যন্ত ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। বাস্তবে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এটি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও বাজারে তারল্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কারণে এ লক্ষ্য অর্জন চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে ঝুঁকি

মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতি এখনো একটি নাজুক পুনরুদ্ধার পর্যায়ে রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা ঝুঁকি সামনে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে অপরিশোধিত তেল, এলএনজি ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হলে আমদানি ব্যয় আরো বাড়তে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

খেলাপি ঋণ কমানোর পরিকল্পনা

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। এটি কমাতে ১৮ মাসের একটি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর প্রথম ছয় মাসের নীতিমালা ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। আগের মতো ঋণ পুনঃতফসিলকে আর উৎসাহিত করা হবে না। এক্সিট পলিসিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে অকার্যকর ঋণের দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়।

তিনি বলেন, আগামী বছরে অর্থঋণ আদালত আইন ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন আনা হবে। অর্থঋণ আদালত আইনে ঋণসংক্রান্ত মামলার বিচার সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে শেষ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে ২০২৭ সাল থেকে ব্যাংকিং খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে গভর্নর বলেন, কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিধি লঙ্ঘন ধরা পড়লে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগে অনেক ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন শাস্তি দেওয়া হলেও এখন থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মেঘনা গ্রুপের বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে ঋণের সুদহার এখন ১২-১৪ শতাংশ। কোনো উদ্যোক্তা যদি বিদেশ থেকে ৫-৬ শতাংশ সুদে ঋণ আনতে পারেন, তাহলে সেটিকে উৎসাহিত করা হবে।

সিটি গ্রুপের দায় সংক্রান্ত বিষয়ে গভর্নর বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পর সংশ্লিষ্ট তিনটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। তারা অন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করছে।

তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকগুলোকে ১৭ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা বেড়ে ৫১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে গত চার মাসে সাধারণ ব্যাংকগুলোকে নতুন কোনো তারল্য সহায়তা দিতে হয়নি। শুধু ইসলামী ব্যাংককে ১৩ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। আমি সবাইকে অনুরোধ করব, একটু ধৈর্য ধরুন।

গভর্নর বলেন, ৫ আগস্টের পর কিছু ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত তারল্য জমা হয়েছে। এ কারণে তারা অস্বাভাবিক মুনাফা করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) সর্বোচ্চ চার শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক ব্যাংকে এই ব্যবধান গড়ে ৬ শতাংশ, কোথাও কোথাও ৭-৯ শতাংশ পর্যন্ত। স্প্রেড চার শতাংশে নামিয়ে আনা গেলে আমানতকারীরা বেশি সুদ পাবেন, ঋণগ্রহীতারাও তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নিতে পারবেন। এতে ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা ও ভারসাম্য বাড়বে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...