আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

একীভূত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে

রোহান রাজিব

একীভূত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে

দেশের ব্যাংক খাতে গত বছরের শেষ তিন মাসে ৮৭ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কমেছে। এ সময় প্রায় সব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমলেও একীভূত পাঁচ ব্যাংকের সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

একীভূত পাঁচ ব্যাংক হলো— এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক। পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের। বাকি চারটি ছিল চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার ও বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তারা দুজনেই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এসব ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

বিএফআইইউয়ের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এস আলম গ্রুপ এ পাঁচটি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে এক লাখ এক হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা নিয়ে গেছে।

ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা জানান, এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির জন্য এস আলম ও নজরুল ইসলাম মজুমদার দায়ী। তারা ব্যাংকগুলোর দায়িত্বে থাকাকালে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে অর্থ লুট করেছেন। এখন এসব অর্থ ফেরত দিচ্ছেন না। ফলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়ছে। একই সঙ্গে সরকারকে ব্যাংকগুলো একীভূত করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে খেলাপি ছিল ৩০ হাজার ৭১০ কোটি টাকা বা ৫৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ছিল ১৪ হাজার ৫০ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে ছিল ১৪ হাজার ১৪ কোটি টাকা বা ৯৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ডিসেম্বর শেষে হয়েছে ৬০ হাজার ১১৭ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে ছিল ৫৯ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ২০ শতাংশ। এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের গত বছর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ৩০ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বা ৮০ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা গত সেপ্টেম্বরে ছিল ২৭ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা বা ৭০ দশমিক ১৭ শতাংশ। ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা বা ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে শেষে ছিল ২৭ হাজার ১১০ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছর ধরে এই পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করার বিষয়ে কাজ করছে। এ নিয়ে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন, সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও দায় পর্যালোচনা, ব্যাংক পাঁচটিকে কারণ দর্শানোর নোটিস প্রদান ও সময় দেওয়ার পাশাপাশি আরো বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৯ অক্টোবর পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার প্রস্তাব অনুমোদন করে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ।

কেন একীভূত

উপদেষ্টা পরিষদে উপস্থাপিত সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণসহ সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা আনার উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যাংক খাত সেক্টর সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ করতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দুটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়। শ্রীলঙ্কাভিত্তিক এ দুই প্রতিষ্ঠান হচ্ছে কেপিএমজি এবং ইআই।

উপদেষ্টা পরিষদকে জানানো হয়, এক বছরের বেশি সময় ধরে পাঁচ ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। এ সত্ত্বেও ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটেনি, বরং তাদের তারল্য সংকট আরো ঘনীভূত হয়। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, খেলাপি বিনিয়োগ/ঋণ ও অগ্রিমের হার, প্রভিশন ঘাটতি এবং তারল্য সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তারা আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ করতে পারছিল না।

যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে

উপদেষ্টা পরিষদকে জানানো হয়, শরিয়াহ্ভিত্তিক রাষ্ট্র মালিকানাধীন নতুন ব্যাংক গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে সিমুলেশন অনুশীলন (এক্সারসাইজ) করেছে। কোনো জরুরি অবস্থা বা ঘটনার সময় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, তা পরীক্ষা করা হয় যে পদ্ধতির মাধ্যমে, সেটাই হচ্ছে সিমুলেশন অনুশীলন। এর ভিত্তিতে ব্যাংকটির জন্য আগামী ১০ বছর মেয়াদি একটি আর্থিক ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে।

এছাড়া নতুন ব্যাংকের কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এজন্য গত ৮ সেপ্টেম্বর একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করেছে। ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ সভায় অনুমোদন করা হয়েছে ‘রেজু্লেশন পরিকল্পনা ২০২৫’। ২৪ সেপ্টেম্বর ব্যাংক খাত সংকট ব্যবস্থাপনা কাউন্সিলের (বিসিএমসি) সভায় পাঁচ ব্যাংকের লোকসানের দায়ভার বহন করার সিদ্ধান্ত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের অভিহিত মূল্য, বাজারমূল্য ও প্রকৃত সম্পদমূল্য (এনএভি) পর্যালোচনা করে দেখেছে, প্রতিটি ব্যাংকের এনএভি ঋণাত্মক এবং প্রতিটিতে বিপুল পরিমাণ মূলধন ঘাটতি, মন্দ সম্পদ ও তারল্য সংকট রয়েছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। আর আমানতকারীদের ১৫ হাজার কোটি টাকার আমানত শেয়ারে রূপান্তর করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন