দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের গুলি ও কথিত ‘পুশইন’, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রশাসনে দলীয়করণ এবং বিচারিক কার্যক্রমের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাত দফা প্রস্তাব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সভা শেষে গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রস্তাবে দলটি জানায়, দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সর্বসম্মতিক্রমে এসব প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।
প্রস্তাবের প্রথমেই সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। দলটির মতে, গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে জনগণের যে রায় এসেছে, তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য বজায় রাখতে সব রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। এ জন্য নিয়মিত বাজার মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম জোরদার, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, উৎপাদন খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং জ্বালানি খাতে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
তৃতীয় প্রস্তাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাস দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি অপরাধীদের দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং বিচারব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ ও কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া সীমান্তে ভারত কর্তৃক অবৈধ ‘পুশইন’ প্রতিরোধ, সীমান্ত হত্যা বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ, পানি-সংক্রান্ত বিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী যেকোনো বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানোরও আহ্বান জানানো হয়েছে।
চতুর্থ প্রস্তাবে গণতন্ত্র ও স্থানীয় প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত প্রশাসকদের অপসারণের আহ্বানও জানানো হয়েছে।
পঞ্চম প্রস্তাবে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোকে দলীয়করণমুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পরিচালনা, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য এবং শক্তিশালী ও স্বাধীন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে।
ষষ্ঠ প্রস্তাবে বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনর্নির্ধারণ এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবসর সুবিধা ও প্রাপ্য ভাতা দ্রুত পরিশোধের দাবি জানানো হয়েছে।
সপ্তম প্রস্তাবে জুলাই গণহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিচার দ্রুত, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি ও অভিযুক্তদের জামিনে মুক্তি জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
প্রস্তাবের শেষাংশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আশা প্রকাশ করে, এসব প্রস্তাব আন্তরিকতা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসন ও আইনের শাসন আরও সুদৃঢ় হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ, নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সচেতন নাগরিকদের এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

