সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যু নিছক সড়ক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল—তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, সাইফুর রহমানের মতো একজন অর্থনীতিবিদ, যিনি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তার মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সাবেক অর্থ, পরিকল্পনা ও বাণিজ্যমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের ১৭তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এম. সাইফুর রহমান স্মৃতি পরিষদ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সাইফুর রহমানকে বিএনপির গৌরব ও জাতির সম্পদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে-বিদেশে তার অর্জন স্বীকৃত। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে তিনি তার মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
সাবেক এই অর্থমন্ত্রীর অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রিজভী বলেন, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) চালুর সময় ব্যাপক সমালোচনা হলেও পরবর্তী সময়ে কেউ তা বাতিল করেনি। বরং দেশের অর্থনীতিতে ভ্যাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, সাইফুর রহমানের সময়ে দেশের অর্থনীতি ছিল সুশৃঙ্খল। তখন ব্যাংক লুট, ব্যাপক অর্থপাচার কিংবা ব্যাংক থেকে সরকারের ঘাটতি বাজেট পূরণের মতো ঘটনা শোনা যায়নি। তার নীতি ও ব্যবস্থাপনার কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্ত অবস্থানে ছিল।
রিজভী অভিযোগ করে বলেন, ‘শেখ হাসিনা বড় বড় বক্তৃতা দিয়ে লুটপাটের রাজনীতি করেছিলেন। লুটপাট ও টাকা পাচার আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল।’ তিনি বলেন, সাইফুর রহমান টাকা পাচার বন্ধে কাজ করেছেন। বিগত ১৭ বছরে ব্যাংক লুট ও অর্থপাচারের যে চিত্র দেখা গেছে, সাইফুর রহমানের সময়ে তা দেখা যায়নি।
বিএনপি সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রমের প্রশংসা করে রিজভী বলেন, দারিদ্র্য নিরসনে বিএনপি সরকার বরাবরই চ্যাম্পিয়ন। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে সাইফুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। উত্তরাঞ্চলের মৌসুমি অভাব ‘মঙ্গা’ মোকাবিলায় তিনি বিকল্প কর্মসংস্থান ও কৃষির বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, মসলা জাতীয় পণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নত হলে কৃষির অফ-সিজনে মানুষ ভ্যান, রিকশা, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত হতে পারে। এভাবেই দারিদ্র্য বিমোচনের পথ তৈরি হয়।
রিজভী বলেন, সাইফুর রহমান শুধু দেশের অর্থনীতিতেই অবদান রাখেননি, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সম্মানিত ছিলেন। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের বিষয়।
সাইফুর রহমানের সামাজিক নিরাপত্তা ভাবনার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর ধারণা তিনি সামনে এনেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড, হেলথ কার্ড এবং খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, সাইফুর রহমানের বহুমাত্রিক অবদান নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে। তার দেখানো পথ অনুসরণ করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, দারিদ্র্যমুক্ত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও মরহুম এম. সাইফুর রহমানের ছোট ছেলে এম. নাসের রহমান এমপি। এতে আরো উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ্ব জি.কে. গউছ এমপি, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সরকারি তিতুমীর কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি এ.জি.এম শামসুল হক, জাসাস সভাপতি চিত্রনায়ক হেলাল খানসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
আলোচনা শেষে রিজভী মরহুম এম. সাইফুর রহমানের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


