দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন আপাতত স্থগিত হচ্ছে না। বুধবার যথারীতি লেনদেন হবে বলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়নের বিষয়ে বাংলাদশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে লিখিত বক্তব্য পাওয়া গেলে লেনদেন স্থগিতের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে ডিএসইর প্রধান অপারেশন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম আমার দেশকে জানান।
তিনি বলেন, আমরা এ বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জানতে চেয়েছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তরফ থেকে চিঠি বা মেইলে যদি আমাদেরকে জানানো হয় তখন আমরা লেনদেন স্থগিতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিব। তার আগ পর্যন্ত লেনদেন চলবে।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ব্যাংকবহির্ভূত পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান —এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং বন্ধ বা অবসায়নের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে।
এরমধ্যে আভিভা ব্যতিত চারটি প্রতিষ্ঠান পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, আগামী জুলাই থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ বা অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
বন্ধ বা অবসায়নের এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপি ঋণের অর্থ আদায় করতে পারছে না। ফলে আমানতকারীদের অর্থও ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক এ অনুমোদন দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, ব্যাংক রেজুলেশন আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ বা অবসায়ন করা হবে। অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পরিচালককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া আরও দুজন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর ঘোষণা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, অবসায়ন বা বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়া পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এ জন্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। সরকারের পক্ষ থেকে আগামী বাজেটে এ অর্থ বরাদ্দ রাখার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরই প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংক রেজুলেশন আইনে আর্থিক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে একীভূত, পুনর্গঠন বা বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদারদের অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হবে, তাও আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে।
উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কেন ২০টি এনবিএফআই বন্ধ করা হবে না—এ মর্মে গত বছরের মে মাসে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে নয়টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার বা ঘুরে দাঁড়ানোর কর্মপরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় সেগুলো বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ফাস্ট ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেখান থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে ছয়টি বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বিআইএফসিকে বাদ দেওয়া হয়। এবার প্রিমিয়ার লিজিংকেও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির কারণেই এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ এত বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের (পরে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিকে হালদার চারটি এনবিএফআই—পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, ফাস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি থেকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

