পাঁচ লিজিং কোম্পানির অবসায়ন

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির মধ্যে ফের সমন্বয়হীনতা

408
কাওসার আলম

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির মধ্যে ফের সমন্বয়হীনতা

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অবসায়ন কিংবা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। আগামী জুলাই মাস থেকে অবসায়নের সিদ্ধান্ত কার্যকরে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পরিচালককে প্রশাসক নিয়োগ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভার ওই সিদ্ধান্ত হলেও এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনোকিছু জানানো হয়নি।

যে পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন কিংবা বন্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো—ফাস ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স ও আভিভা ফাইন্যান্স। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আভিভা ব্যতীত অপর চারটি প্রতিষ্ঠানই দেশের উভয় স্টক এক্সচেঞ্জ তালিকাভুক্ত। অথচ পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কিংবা স্টক এক্সচেঞ্জকে এ বিষয়ে কোনোকিছুই জানানো হয়নি। এর আগে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলেও সেটিও বিএসইসি কিংবা স্টক এক্সচেঞ্জকে জানানো হয়নি। পরবর্তীতে ওই ব্যাংকগুলোর লেনদেন স্থগিত করা হয়।

বিজ্ঞাপন

জানতে চাইলে বিএসইসির পরিচালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র মো. আবুল কালাম গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় আমার দেশকে বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়নের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কোনোকিছু জানতে পারিনি। প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারবাজারে লেনদেন চালু থাকবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, স্টক এক্সচেঞ্জের লিস্টিং রেগুলেশন অনুযায়ী এ ব্যাপারে পূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষের। লিস্টিং, ডিলিস্টিং কিংবা লেনদেন স্থগিতের বিষয়ে তারাই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। বিএসইসির এখানে তেমন কিছু করার নেই।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্তের বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকট এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্টক এক্সচেঞ্জকে কোনোকিছুই জানানো হয়নি। এ কারণে গতকাল বুধবার পুঁজিবাজারে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেন হয়।

এ ব্যাপারে ডিএসইর চিফ রেগুলেটরি অফিসার (সিআরও) শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া আমার দেশকে বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়নের বিষয়ে আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা পাওয়ার পর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সঙ্গে আলোচনা করে কোম্পানিগুলোর লেনদেনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব। এর আগে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর একইভাবে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। স্টক এক্সচেঞ্জকে অবহিত না করার বিষয়টির মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের বক্তব্য জানতে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে শেয়ার ও অন্যান্য সিকিউরিটিজ ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষণ ও লেনদেন ব্যবস্থাপনার কাজ করে থাকে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মোতালেব আমার দেশকে বলেন, স্টক এক্সচেঞ্জ কিংবা বিএসইসি থেকে লেনদেন স্থগিতের কোনো সিদ্ধান্ত পেলেই আমরা তা কার্যকর করে থাকি। এখন পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেন স্থগিতাদেশের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আল আমিন আমার দেশকে বলেন, এ ধরনের কোম্পানিগুলোর লেনদেন আরো আগে বন্ধ করে দেওয়া উচিত ছিল। এ ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। স্টক এক্সচেঞ্জ যেহেতু করেনি সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে বিএসইসির ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল।

তিনি আরো বলেন, এসব কোম্পানির আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ, এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আগে বলা হয়েছে। কিন্তু তারপরও কাদের স্বার্থে এগুলোর লেনদেন বন্ধ করা হচ্ছে না। এসব কোম্পানিতে যারা বিনিয়োগ করছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে বিনিয়োগকারী নয়। কারসাজির সঙ্গে যারা জড়িত, তারাই এ ধরনের কোম্পানির শেয়ার কিনছেন। এগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীর সুরক্ষায় অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় যারা দায়িত্বে রয়েছেন, তারা কি করছেন?

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপি ঋণের অর্থ আদায় করতে পারছে না। ফলে আমানতকারীদের অর্থও ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক এ অনুমোদন দিয়েছে। ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৬ আওতায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবসায়ন কিংবা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। অবসায়ন বা বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়া পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এজন্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। সরকারের পক্ষ থেকে আগামী বাজেটে এ অর্থ বরাদ্দ রাখার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরই প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ফাস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

এর আগে, নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ফাস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও প্রিমিয়ার লিজিং।

তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেখান থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে ছয়টি বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বিআইএফসিকে বাদ দেওয়া হয়। এবার প্রিমিয়ার লিজিংকেও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন