নতুন সরকারের দ্বিতীয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রায় ২৪ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্প উপস্থাপনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছয়টি নতুন, ছয়টি সংশোধিত ও মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য চারটি চলমান প্রকল্প রয়েছে। সভায় দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে একটি মেগা প্রকল্পও একনেকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আজ বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে, যার মধ্যে ১১ নম্বর কার্যতালিকায় রয়েছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। অনুমোদন মিললে চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। প্রথম ধাপের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। পুরো অর্থায়ন সরকারি তহবিল থেকেই করা হবে।
কর্মকর্তারা জানান, একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মূলত ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানির যে সংকট দেখা দেয়, তা থেকে কিছুটা রেহাই পেতে প্রকল্পটি প্রস্তুত করা হয়েছে। সেজন্য কয়েক দশকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পদ্মা ব্যারাজ নামে প্রকল্পটি পাসের অপেক্ষায় আছে। গত মাসে কমিশন প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের প্রথম একনেক সভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুতি নিলেও শেষ মুহূর্তে তা প্রত্যাহার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। সংরক্ষিত পানি দিয়ে পাঁচটি নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এগুলো হলো—হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে রাজবাড়ীর পাংশায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। ব্যারাজটিতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, মাছ চলাচলের জন্য দুটি ফিশ পাস, একটি নেভিগেশন লক এবং গাইড ও সংযোগ বাঁধ।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পদ্মা ব্যারাজ ও গড়াই অফ-টেক এলাকায় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্র থেকে মোট ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপের আওতায় ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ গড়াই-মধুমতি নদী এবং ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার হিসনা নদী ব্যবস্থার ড্রেজিং ও পুনঃখননের কাজও করা হবে। অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১৫টি স্পিলওয়েসহ গড়াই অফ-টেক, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক ও ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ। পাশাপাশি চন্দনা অফ-টেকে চারটি স্পিলওয়ে, হিসনা অফ-টেকে পাঁচটি স্পিলওয়ে এবং ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণ করা হবে। হিসনা অফ-টেককে হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি গঙ্গা নদীব্যবস্থা থেকে পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পলি জমা কমানো ও শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহ নিশ্চিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, প্রকল্পে কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর ধান উৎপাদন প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন এবং মৎস্য উৎপাদন প্রায় দুই লাখ ৩৪ হাজার টন বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাস্তবায়নকালে প্রায় ৪৭ হাজার ৯৫০ জনের জন্য ১২ কোটি ২৫ লাখ জন/দিন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা দেশের চারটি বিভাগের ২৬ জেলার ১৬৩ উপজেলায় বিস্তৃত। তবে প্রথম ধাপ বাস্তবায়িত হলে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের অবহেলিত অন্তত ১৯ জেলা ও ১২০ উপজেলা সরাসরি উপকৃত হবে। জেলাগুলো হলো—কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পিরোজপুর। দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।
পদ্মার ওপর ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। প্রায় ২৫ বছর আগে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। পরে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয় এবং স্থানীয় ও বিদেশি পরামর্শকদের একটি কনসোর্টিয়াম ২০১৩ সালে ওই সমীক্ষা শেষ করে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের লাশের পাশে নরেশ পাহান