স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদনের পর তা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে পর্যালোচনা শুরু করেছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পেতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিউইয়র্কে চলমান সিডিপির পাঁচ দিনব্যাপী বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় আসে। কমিটির সদস্য এবং এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) উপকমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সরকারের পাঠানো চিঠি প্রাপ্তির বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। তবে আবেদন গ্রহণ মানেই উত্তরণ স্থগিতের অনুমোদন নয়; আগে উপস্থাপিত যুক্তিগুলো যাচাই–বাছাই করা হবে।
তিনি বলেন, সিডিপি প্রাথমিক মূল্যায়ন শেষে তাদের মতামত জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসোক) পাঠাবে। সেখানে আলোচনা শেষে বিষয়টি যাবে সাধারণ পরিষদে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়।
ড. দেবপ্রিয় আরও জানান, ইএমএম কাঠামোর অধীনে ‘ক্রাইসিস বাটন’ নামে একটি বিধান রয়েছে, যা অপ্রত্যাশিত বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা হয়। বাংলাদেশ এই বিধানের আওতায় আবেদন করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ সত্যিই কোনো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কি না, সেটিই এখন মূল বিবেচ্য বিষয়।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি তালিকা থেকে বের হওয়ার কথা। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নতুন সরকার ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সিডিপির চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী স্বাক্ষরিত আবেদনপত্র পাঠানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক—এই তিন মানদণ্ড পূরণ অব্যাহত থাকলেও প্রস্তুতিমূলক সময়কাল বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অভিঘাতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কোভিড মহামারীর দীর্ঘ প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক কড়াকড়ি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মন্থর পুনরুদ্ধারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে।
দেশীয় প্রেক্ষাপটে আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের আশ্রয় দেওয়ার চাপের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এসব কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে সরকারের দাবি। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির হারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সরকার আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পাল্টা শুল্কারোপও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং স্মুথ ট্রানজিশন কৌশলের আওতায় অগ্রাধিকারমূলক সংস্কার সম্পন্নের জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন বলে আবেদনপত্রে জানানো হয়েছে।
সিডিপি সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকের দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রস্তুত হতে পারে। পরবর্তী ধাপে সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে। সব প্রক্রিয়া শেষে সাধারণ পরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
প্রসঙ্গত, তিন বছর অন্তর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা— এই সূচকের ভিত্তিতে উত্তরণের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে তিন ক্ষেত্রেই মানদণ্ড অতিক্রম করে। ২০২১ সালেই সুপারিশ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে দেশটি তালিকা থেকে বের হবে। পরে মহামারীর প্রভাবে সময়সীমা দুই বছর বাড়ানো হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওস উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। নিউইয়র্কের বৈঠকে এসব দেশের অগ্রগতি ও প্রস্তুতির অবস্থাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এখন নজর সিডিপির সিদ্ধান্তের দিকে, যা নির্ধারণ করবে নির্ধারিত সময়সূচি বহাল থাকবে নাকি নতুন সময়রেখা নির্ধারিত হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

