ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ব্যবসায়িক ক্ষতি, শিল্প উৎপাদনে ঘাটতি, মুনাফা হ্রাসসহ ১১ কারণে দেশে রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) এপ্রিল পর্যন্ত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লক্ষ ৩১ হাজার ৪৬১ দশমিক ২৭ কোটি টাকা। যার বিপরীতে আহরণ করা হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ দশমিক ১৬ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার ৭৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে এসব কথা জানান অর্থমন্ত্রী। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়।
অর্থবছর ২৫-২৬ এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনজনিত সাময়িক শূন্যতা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয়, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং সামষ্টিক অর্থনীতির মন্দাভাব বলেও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তবে বছরের শেষভাগে অটোমেশন ও কর ফাঁকি রোধে এনবিআরের কঠোর অবস্থান এই ঘাটতি কিছুটা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করছে।
রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার ১১টি কারণ উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। সেগুলোর মধ্যে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস—দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রায় দুই অঙ্কের (কাছাকাছি ১০%) উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী শ্রেণীর প্রকৃত সঞ্চয় বা করযোগ্য উদ্বৃত্ত আয় কমে গেছে।
ব্যবসায়িক ক্ষতি: এই সময়ে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে এবং খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়, যা সরাসরি কর্পোরেট কর আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিল্প উৎপাদনে ঘাটতি: গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে অনেক তৈরি পোশাক ভও অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্প তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারেনি।
মুনাফা হাস: উচ্চ সুদহার (মনিটারি পলিসি টাইট করার কারণে ব্যাংকের ঋণের সুদ বৃদ্ধি) এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। ফলে বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা কমে গেছে, যা আয়করের বড় উৎস।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক সরকার না থাকা, বিনিয়োগ কম, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা, উৎপাদন ও সরবরাহ কম, মূসক ও সম্পূরক শুল্ক প্রদানকারী বেশ সংখ্যক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগ কম, আমদানি কম, উৎপাদন ও সরবরাহ কম, মূসক ও সম্পূরক শুল্ক প্রদানকারী বেশ সংখ্যক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া। ২৫ ও ১০ শতাংশ শুল্কহার বিশিষ্ট পণ্যের আমদানি বিগত বছরের চেয়ে যথাক্রমে ১৮ ও ৩৭ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায় চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
জ্বালানী পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখার উদ্দেশ্যে সরকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পেট্রোলিয়াম পণ্যের শুল্ক-কর কমানো হয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে, যার ফলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি সংশ্লিষ্ট এস. আর.ও তে চলতি অর্থবছরে নতুন এইচ.এস. কোড সংযোজনের ফলে রাজস্ব আহরণ কম হয়েছে; বিলাসবহুল গাড়ির ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় গাড়ি কম আমদানি হওয়ায় রাজস্ব আহরণ কম হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং সরকার পরিবর্তনের কারণে দেশজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতা সরবরাহ শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ে এবং খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়, যা সরাসরি কর্পোরেট কর আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে গৃহীত ঋণের স্থিতি ৩ লাখ ১৩ হাজার ৬৭০ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা। অপরদিকে চলতি মে পর্যন্ত ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড ও বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকের মাধ্যমে সরকারের গৃহীত ঋণের স্থিতি ৮ লাখ ৯৩ হাজার ৮৩৭ দশমিক ২৬ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় চলতি বছরের মার্চের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে গৃহীত ঋণের স্থিতির পরিমাণ ২২১ দশমিক ০১ কোটি টাকা বেশি। অপরদিকে বিগত অর্থবছরের (২০২৫) মে মাসের তুলনায় চলতি মে পর্যন্ত ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড ও বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকের মাধ্যমে গৃহীত ঋণের স্থিতির পরিমাণ ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৩৫ দশমিক ৪৬ কোটি টাকা বেশি।
সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহা. রবিউল বাশারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপরিশোধিত বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৭৮ হাজার ৬৭ দশমিক ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ।
এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ তিনটি জলবায়ু অর্থায়ন তহবিল গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ), গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) ও এডাপটেশন ফান্ড (এএফ) থেকে জলবায়ু অর্থায়ন পেয়ে থাকে। তহবিল তিনটের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৪৮৪ দশমিক ৪১১ মিলিয়ন ইউএস ডলার প্রাপ্ত হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

