একদিকে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপ, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে চাপে সাধারণ মানুষ। এর মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে প্রত্যাশা যেমন বড়, তেমনি উদ্বেগও কম নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি ও বিনিয়োগে স্থবিরতার মতো অস্থির সময়ে আসছে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় বাজেট। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হতে পারে। চলতি অর্থবছরের সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেটের মোট আকার দাঁড়াতে যাচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। সরকার বাজেটকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বাড়ছে চাপ
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন ঋণপ্রবাহ কমে এলেও পুরোনো ঋণ পরিশোধের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ বাংলাদেশ পরিশোধ করেছে ৩৮০ কোটি ২০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ৩৫০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় আট দশমিক ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ৪২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি এসেছে ২৮০ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতে বরাদ্দের পাশাপাশি ঋণসেবার এই বাড়তি ব্যয় সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ তৈরি করবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও কঠিন পরীক্ষা
ঋণের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাত দশমিক পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি সে লক্ষ্যকে কঠিন করে তুলছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রভাব নিত্যপণ্যের ওপর পড়ছে।
বিবিএসের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে। মার্চে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব এবং সরবরাহ ব্যবস্থার চাপে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা গেলে বাজেটের সামাজিক কল্যাণমূলক উদ্যোগগুলোর সুফলও অনেকাংশে কমে যেতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ঘাটতি মেটাতে বাড়বে ঋণনির্ভরতা
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতির বড় অংশই ঋণের মাধ্যমে অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


