করের হার বৃদ্ধি না করে উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিড আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ড. তিতুমীর বলেন, অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদনমুখী শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিল্প খাতের সম্প্রসারণ ঘটলে নতুন বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি ফিরবে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও করের বোঝা বাড়ানোর পরিবর্তে উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করাই হওয়া উচিত মূল কৌশল।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সরকার ধীরে ধীরে উৎপাদনভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে পুনরুদ্ধার, পুনর্বহাল ও গতিশীলতার জন্য পুনর্গঠন—এই তিনমুখী কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা জানান, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে নীতির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের কর কাঠামোর রূপরেখা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ ও প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর জন্যও সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি কার্যক্রমের সমালোচনা করার আহ্বান জানিয়ে ড. তিতুমীর বলেন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গঠনমূলক সমালোচনা প্রয়োজন। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার নীতি বাস্তবায়নে অধিক স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শুধু করের আওতা বৃদ্ধি কিংবা হার সমন্বয় করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। পদ্ধতিগত দুর্বলতা দূর করা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে আইবাস পদ্ধতি চালু থাকলেও কর অব্যাহতি, ফাঁকি ও জালিয়াতির মতো সমস্যা এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। এ কারণে আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট খাতে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
আলোচনা সভায় র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, সরকারের ‘থ্রি আর’—রিকভারি, রিফর্ম ও রিকনস্ট্রাকশন—ভিত্তিক উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা না গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। আবার মূল্যস্ফীতি কমানোর আগেই প্রবৃদ্ধির ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে মূল্যচাপ আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৮ শতাংশ নামমাত্র জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। তবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে মুদ্রার অতিরিক্ত অবমূল্যায়ন রোধেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি আরো বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সর্বোচ্চ সক্ষমতা প্রয়োগ করলেও আগামী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি থেকে যেতে পারে। বিদেশি ঋণ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, কারণ বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন সংকুচিত হচ্ছে।
র্যাপিডের চেয়ারম্যান বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় দায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালে সুদ পরিশোধে ব্যয় হওয়া অর্থ এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায়ের প্রায় ৩৬ শতাংশের সমান ছিল। অন্যদিকে আগামী অর্থবছরে সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ের প্রায় ৩১ শতাংশ বিদেশি ঋণের দায় পরিশোধে ব্যয় হতে পারে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ আরও বাড়বে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত নিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধির উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকলেও অনেক সময় তা যথাযথভাবে ব্যয় করা যায় না। এজন্য উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

