দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করতে হলে ডিজিটালাইজেশনের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড” এবং “ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট” ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে এবং এ লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে।
আশা করা যাচ্ছে, আগামী বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে। প্রত্যেক নাগরিকের একটি করে ব্যাংক হিসাব থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন, ১.৩ বিলিয়ন মানুষের দেশে যদি এটি সম্ভব হয়, তাহলে বাংলাদেশেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। পুরো ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে।
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)-এর ডিজিটাল ‘ইউসিবি ওয়ান’ অ্যাপ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট, চ্যালেঞ্জ এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত সমস্যা, নীতিগত দুর্বলতা এবং পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক সংস্কৃতির কারণে ব্যাংকিং খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। তবে প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রয়েছে; ফরেনসিক অডিট করা হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক ব্যাংক ৯৫ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ। ইসলামী ব্যাংকিং খাতেও একই ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। এছাড়া স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদান একটি বড় কাঠামোগত সমস্যা তৈরি করছে। দেশের পুঁজিবাজার এখনও পর্যাপ্ত শক্তিশালী না হওয়ায় বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ সীমিত।
ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, প্রথমত, গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ও জটিল চার্জ কমাতে হবে, যাতে মানুষ ব্যাংকমুখী হয়। দ্বিতীয়ত, আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলোকে উদ্ভাবনী প্রণোদনা চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠন করা জরুরি।
তিনি বলেন, ব্যাংক ঋণ অল্প কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে, যার ফলে দারিদ্র্য বেড়েছে। গত সরকারের শেষ সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৩ শতাংশে নেমে আসে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে যুব দারিদ্র্য বেড়েছে। পাশাপাশি নারীদের মধ্যেও দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।
তিনি আরও বলেন, দেশের শিল্পখাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাব যুক্ত হয়ে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে বর্তমান সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে বাড়তি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বেসরকারি খাতের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার সবসময় উৎসাহ প্রদান করছে এবং বিনিয়ন্ত্রণীকরণ (ডিরেগুলেশন)-এর পক্ষে রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে যেন কোনো বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একটি কার্যকর অর্থনীতির জন্য বাজারকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিচালিত হতে দিতে হবে। তবে বর্তমানে বাজার প্রত্যাশিতভাবে কাজ করছে না, যার পেছনে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রত্যয়ন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা অন্যতম কারণ।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ একটি টেকসই ও গতিশীল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

