বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির

সার্কুলার অর্থনীতিতে রূপান্তর জরুরি

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

সার্কুলার অর্থনীতিতে রূপান্তর জরুরি
ছবি: আমার দেশ

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, সার্কুলার অর্থনীতিতে রূপান্তর এখন আর কেবল পরিবেশগত কোনো আলোচনার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্পখাতের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করার অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত।

বুধবার (৬ মে) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর যৌথ আয়োজনে ‘বাংলাদেশে SWITCH2CE পাইলট উদ্যোগের মাধ্যমে সার্কুলার অর্থনীতির রূপান্তর ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। টেকসই উৎপাদন এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার অন্যতম নির্ধারক। ক্রেতা, বিনিয়োগকারী ও ভোক্তারা এখন এমন উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহী, যা দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পরিচয় বহন করে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খান সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন— বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত প্রধান মাইকেল মিলার এবং বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘SWITCH to Circular Economy’ কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত পাইলট কার্যক্রম ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে সার্কুলার অর্থনীতিতে রূপান্তর কোনো কল্পনাপ্রসূত ধারণা নয়; এটি বাস্তবসম্মত, অর্জনযোগ্য এবং এর বাস্তবায়ন ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।

muktadir-2

তিনি জানান, এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপ ও বেস্টসেলারের সহযোগিতায় পরিচালিত পাইলট কার্যক্রমগুলো বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে টেক্সটাইল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা এবং ভ্যালু চেইন সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিল্পখাতকে একটি কাঠামোগত ও সামগ্রিক সার্কুলার রূপান্তরের পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

খন্দকার মুক্তাদির বলেন, সার্কুলার অর্থনীতির মাধ্যমে সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা, বর্জ্য হ্রাস, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা জোরদার, উদ্ভাবন ও মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত অত্যন্ত সম্পদনির্ভর হওয়ায় পুনর্ব্যবহার ও পুনঃচক্রায়নের ভিত্তিতে একটি টেকসই উৎপাদনব্যবস্থায় রূপান্তর পরিবেশগত চাপ কমাতে এবং টেকসই শিল্পায়নকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মন্ত্রী বলেন, সার্কুলার রূপান্তর তখনই সফল হবে যখন সরকার, শিল্পখাত, বৈশ্বিক ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি সরবরাহকারী এবং উন্নয়ন সহযোগীরা সমন্বিতভাবে কাজ করবে। তিনি উল্লেখ করেন, পাইলট কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় কৌশল প্রণয়নের চলমান উদ্যোগ ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, সরকার উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা, টেকসই বিনিয়োগকে সহায়তা দেওয়া এবং অংশীজনদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে বাণিজ্যমন্ত্রী এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ নতুন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। আমরা স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা এবং এলডিসিভিত্তিক অনেক বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার হারাবো। তাই এখন থেকেই আমাদের অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব করে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের লজিস্টিক কস্ট টু জিডিপি রেশিও প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ১০ শতাংশ। এই ব্যয় কমাতে সরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ইতোমধ্যে একটি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব একটি ড্যানিশ কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষ প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিনিয়োগ পরিবেশ সহজীকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন অনুমোদন ও লাইসেন্সের জন্য বহু প্রতিষ্ঠানের দ্বারে যেতে হয়, যা সময় সাপেক্ষ ও জটিল। সরকার এমন একটি ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে, যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের পরই অস্থায়ী অনুমোদন পাবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। পরবর্তী ১২ মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় স্থায়ী অনুমোদন ও লাইসেন্স সংগ্রহের সুযোগ থাকবে।

তিনি আরও বলেন, আমরা ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে সত্যিকারের ওয়ান-স্টপ সার্ভিসে পরিণত করতে চাই। বিনিয়োগকারীদের আর এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ঘুরতে হবে না।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের উৎপাদিত প্রতিটি পণ্য— তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য কিংবা পাটজাত পণ্য সবকিছুকেই টেকসই হতে হবে।

তিনি বলেন, বিশ্ব আজ উপলব্ধি করেছে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে মানবসভ্যতা টিকে থাকতে পারে না। তবে উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধিও রয়েছে বর্তমান কার্বন ও দূষণ সংকটের জন্য প্রধানত দায়ী উন্নত অর্থনীতিগুলো। তাই একটি টেকসই বৈশ্বিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে উন্নত দেশগুলোকেই নেতৃত্ব দিতে হবে।

সেমিনারে বক্তারা বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে সার্কুলার অর্থনীতির প্রসার, টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এমবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন