এশিয়ার সেরাদের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই আইচি-নাগোয়ায়

এশিয়ার সেরাদের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই আইচি-নাগোয়ায়

১৯ সেপ্টেম্বর পর্দা উঠতে যাচ্ছে ২০তম এশিয়ান গেমসের। জাপানের আইচি ও নাগোয়া শহরজুড়ে বসবে এশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় তারকাদের মিলনমেলা। ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এ আসরে অংশ নেবেন ১১ হাজারের বেশি ক্রীড়াবিদ। অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন থেকে বিশ্বসেরা তারকা—কে হবেন মহাদেশের নতুন নায়ক, সে লড়াইয়ে চোখ থাকবে পুরো এশিয়ার। এশিয়ান গেমস মানেই কেবল পদকের লড়াই নয়, একইসঙ্গে এশিয়ার ক্রীড়াশক্তির নতুন মানচিত্র আঁকারও মঞ্চ। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, অলিম্পিক পদকজয়ী এবং উদীয়মান তারকাদের নিয়ে আইচি-নাগোয়া হয়ে উঠতে যাচ্ছে ক্রীড়ার মহারণের মহামঞ্চ।

বিজ্ঞাপন

হট ফেভারিট চীন

এশিয়ার ক্রীড়াশক্তির সবচেয়ে বড় নাম চীন। পদক তালিকার শীর্ষে থাকার দৌড়েও সবচেয়ে এগিয়ে চীন। ১৯৮২ সালের পর প্রতিটি এশিয়ান গেমসেই শীর্ষস্থান ধরে রাখা দেশটি এবারও শক্তিশালী দল গড়েছে। ৮১৫ সদস্যের চীনা দলে রয়েছেন ১৩ খেলার ৩৬ অলিম্পিক পদকজয়ী। লক্ষ্য একটাইÑটানা দ্বাদশবারের মতো পদক তালিকার শীর্ষে থাকা।

চীনের শক্তির সবচেয়ে বড় জায়গা তাদের বৈচিত্র্য। সাঁতার, জিমন্যাস্টিকস, ব্যাডমিন্টন, শুটিং, টেবিল টেনিস ও ডাইভিং মিলিয়ে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে বিশ্বমানের তারকা। টেবিল টেনিসে সান ইংশা ও ওয়াং মানইউ, ডাইভিংয়ে চেন ইউশি ও ওয়াং জংইউয়ান এবং ভারোত্তোলনে লি ওয়েনওয়েনের দিকে থাকবে বিশেষ নজর। বিশ্বের এক নম্বর সান ইংশা এরই মধ্যে টেবিল টেনিসে ইতিহাস গড়েছেন। টানা তিনবার বিশ্বকাপ জেতা প্রথম নারী খেলোয়াড় তিনি। ১০ হাজার র‌্যাংকিং পয়েন্ট অতিক্রম করা প্রথম নারীও এই চীনা তারকা। তার সঙ্গে রয়েছেন ওয়াং মানইউ; যিনি বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ, এশিয়ান গেমস ও এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাজয়ী। ডাইভিংয়ে চেন ইউশি ও ওয়াং জংইউয়ান চীনের সোনার অন্যতম বড় ভরসা। দুজনই অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন। আর ভারোত্তোলনে দুবারের অলিম্পিক ও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লি ওয়েনওয়েন আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে প্রস্তুত।

ঘরের মাঠে জাপানের চ্যালেঞ্জ

স্বাগতিক জাপানের সামনে বড় সুযোগ ঘরের মাঠের সুবিধাকে পদকে রূপ দেওয়া। জিমন্যাস্টিকস, সাঁতার, কুস্তি, জুডো, ব্যাডমিন্টন ও স্কেটবোর্ডিংয়ে শক্তিশালী দল নিয়ে নামছে তারা। পাশাপাশি জিউ-জিৎসু, উশু, ক্রিকেট ও কাবাডির মতো খেলায় অংশ নিয়ে আসরের বৈচিত্র্যতা বাড়াতে প্রস্তুত জাপানিরা। জাপানের সবচেয়ে আলোচিত তারকাদের একজন আকানে ইয়ামাগুচি। তিনি ব্যাডমিন্টনে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। অল ইংল্যান্ড, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্ব ট্যুর ফাইনালসের শিরোপাও রয়েছে তার ঝুলিতে। ঘরের দর্শকদের সামনে এবারও তার কাছ থেকে বড় কিছু প্রত্যাশা করবে জাপান।

দক্ষিণ কোরিয়ার বাজি আন সে-ইয়ং

দক্ষিণ কোরিয়ার পদক-স্বপ্নের কেন্দ্রে আন সে-ইয়ং। বিশ্বের এক নম্বর এই ব্যাডমিন্টন তারকা বর্তমান অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন। চলতি মৌসুমে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ জিতে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন তিনি। এশিয়ান গেমসে নিজের শিরোপা ধরে রাখাই হবে তার অন্যতম লক্ষ্য। ফেন্সিংয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার আরেক বড় ভরসা সং সে-রা। ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে দলীয় রুপাজয়ী এই তারকা ২০২২ বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ব্যক্তিগত সোনা জিতেছেন। ২০২৩ এশিয়ান গেমসেও দলকে সোনা এনে দিয়েছিলেন তিনি।

ভারতের ভরসা ক্রিকেটে

ভারতের জন্য এবারের আসরের সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ নীরজ চোপড়ার অনুপস্থিতি। অলিম্পিক পদকজয়ী জ্যাভেলিন তারকা গোড়ালির লিগামেন্টে চোট পেয়ে ছিটকে গেছেন। ফলে ভারতের অন্যতম নিশ্চিত পদকের জায়গায় তৈরি হয়েছে বড় শূন্যতা। এ পরিস্থিতিতে ভারতের সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে উঠতে পারেন মনু ভাকের। অলিম্পিকে দুটি পদকজয়ী এই শুটারের ওপর থাকবে বড় প্রত্যাশা। শুটিং ও অ্যাথলেটিকসেও নজর থাকবে। তবে ভারতের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে পারে ক্রিকেট। পুরুষ ও নারী দুদলই টি-টোয়েন্টিতে সোনা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে।

এবারও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ

এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের অতীত ইতিহাস কখনই আশাব্যঞ্জক ছিল না। পেছনের রেকর্ড বলছে, স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়ার পর বাংলাদেশ ১৯৭৮ সালে সর্বপ্রথম এশিয়ান গেমসে অংশ নিয়ে কোনো পদক জেতেনি। ১৯৮২ সালেও ছিল পদকশূন্য। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় অংশগ্রহণে পদকে নাম লেখায় বাংলাদেশ। বক্সার মোশারফ হোসেন লাইট হেভিওয়েটে ব্রোঞ্চ জিতে হইচই ফেলে দেন। এরপর প্রতিটি আসরে পদক পেলেও প্রত্যাশা পূরণের অনেক দূরে অবস্থান বাংলাদেশের। সব মিলে গত ১২ আসরে বাংলাদেশের ঘরে জমা পড়েছে ১৪টি এশিয়ান গেমসের পদক। যার মধ্যে ছিল একটি স্বর্ণ, তিনটি রৌপ্য ও আটটি ব্রোঞ্জ পদক।

এবারের আসরে বাংলাদেশ ২২টি ডিসিপ্লিনে নারী-পুরুষ মিলে মোট ১৮৭ ক্রীড়াবিদ অংশ নিচ্ছেন। কর্মকর্তাসহ সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬০ জনে। এবারও পদক পাওয়ার স্বপ্ন ও সম্ভাবনার দুয়ারে দাঁড়িয়ে ক্রিকেট, কাবাডি, আরচারি ও শুটিং। জিমন্যাস্টিকস, বক্সিং, ভারোত্তোলন, কুস্তি, টেবিল টেনিস, জুডো এবং ব্যাডমিন্টনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা। বাকি ইভেন্টগুলোয় পাশার দান উল্টে যেতেও পারে। সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় হিসেবেই এশিয়ার অলিম্পিকে যাচ্ছে লাল-সবুজের বহর।

কারা এগিয়ে

পদকের লড়াইয়ে চীনকে এগিয়ে রাখাই স্বাভাবিক। দীর্ঘদিনের আধিপত্য, বিশাল দল এবং প্রায় প্রতিটি খেলায় বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে ঘরের মাঠে জাপান এবং শক্তিশালী দক্ষিণ কোরিয়া চীনকে চাপে রাখতে চাইবে। ভারতও শুটিং, বক্সিং, অ্যাথলেটিকস ও ক্রিকেটে বড় সাফল্যের স্বপ্ন দেখছে। তবে পদকের হিসাব যতই আগে করা হোক, মাঠের লড়াই শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত কিছুই বলা যায় না। আইচি-নাগোয়ার মঞ্চে তাই শুধু চ্যাম্পিয়নদের নয়, নতুন তারকার উত্থানের অপেক্ষাতেও থাকবে গোটা এশিয়া।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন