পাবনার ঈশ্বরদীতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন আর দলীয় কোন্দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গত দুই বছরে দুই পক্ষের বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে একের পর এক সংঘর্ষ, গোলাগুলি, হামলা, ভাঙচুর আর অস্ত্রের মহড়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। রাজনৈতিক আধিপত্যের পাশাপাশি বালুমহাল, ঝুট ব্যবসা, টেন্ডার, পরিবহন স্ট্যান্ড ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ এই কোন্দল ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম শরিফকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনি এখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবকে দায়ী করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন শরিফ।
এর কয়েক দিন আগে গত ১৭ আগস্ট মাথা ও শরীরে কাফনের কাপড় জড়িয়ে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঈশ্বরদী শহরের বিভিন্ন সড়কে মহড়ার অভিযোগ ওঠে হাবিবপন্থি সাবেক ছাত্রদল নেতা জুবায়ের হোসেন বাপ্পীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ থানার সামনে অবস্থান নেন। তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছেড়ে দিয়েছে এমন অভিযোগ তুলে পরদিন জাকারিয়া পিন্টুর অনুসারীরা থানা ঘেরাও করে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব এবং জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুর অনুসারীদের বিরোধ দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ্য সংঘর্ষ ও অস্ত্রের রাজনীতিতে রূপ নেয়।
এর পরদিনই উপজেলার সাহাপুরের জিগাতলায় ছাত্রদল কর্মী শচীন বিশ্বাসকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২৯ আগস্টও দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। ১৮ অক্টোবর আরামবাড়িয়া বাজারে গোলাগুলিতে যুবদল নেতা সোহান পারভেজ বিপু গুলিবিদ্ধ হন। ১২ ও ১৩ নভেম্বর মাজারের বিরোধ ও পাকশী ইপিজেড এলাকায় সংঘর্ষে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। ৮ ডিসেম্বর পাকশীর বাঘইল কাঁঠালতলায় সংঘর্ষে হাবিবপন্থি যুবদল কর্মী হাজি সেলিমসহ দুজন গুলিবিদ্ধ হন। ১৩ ডিসেম্বর চরাঞ্চলের খাসজমি নিয়ে বিরোধে গুলিবিনিময়ে একজন আহত হন।
২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সাঁড়া ইউনিয়নের মাজদিয়ায় সংঘর্ষ, ১১ ফেব্রুয়ারি সাবেক মেয়র মকলেছুর রহমান বাবলুর কারামুক্তির আনন্দ মিছিলকে কেন্দ্র করে গোলাগুলি, ১২ এপ্রিল ঈশ্বরদী ইপিজেডের ঝুট ব্যবসা এবং ১৩ এপ্রিল দাশুড়িয়ার ট্রাফিক মোড়ে সিএনজি স্ট্যান্ডের দখল নিয়ে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে।
এরপর ২১ এপ্রিল ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের সামনে সংঘর্ষ, ৩০ এপ্রিল গুলিতে একজন আহত, ২২ মে সাঁড়া ইউনিয়নের বালুরঘাট নিয়ে সংঘর্ষে চারজন গুলিবিদ্ধ এবং ৫ জুন সাঁড়াঘাটে বালুমহালের আধিপত্য নিয়ে ৪০ থেকে ৫০ রাউন্ড গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। ১১ জুন রূপপুর প্রকল্পসংলগ্ন বালুরঘাট নিয়েও গোলাগুলি হয়। ৩০ জুন মাদক কেনাবেচার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে দুজন গুলিবিদ্ধ হন। ৪ ও ১২ জুলাই পদ্মা নদীর বালুরঘাট নিয়ে আবারও গোলাগুলি হয়। ২১ জুলাই সাহাপুরে পিন্টুপন্থি এক কর্মীর বাড়িতে ভাঙচুর, গুলি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ৩১ আগস্ট ও ৯ সেপ্টেম্বরও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গুলিবিনিময় হয়।
৩ অক্টোবর সাহাপুরের আওতাপাড়া গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হাবিবপন্থি ইউনিয়ন কৃষক দলের আহ্বায়ক মক্কেল মৃধার অস্ত্রসহ মহড়া দেন। ৬ অক্টোবর পদ্মা নদীতে খাজনা আদায়ের আধিপত্য নিয়ে গুলিবিনিময়ে দুজন গুলিবিদ্ধ হন। ২৮ অক্টোবর ঈশ্বরদী ইপিজেডে টেন্ডার ড্রপকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা অস্ত্রসহ মহড়া দেন।
চলতি বছরে এসেও সংঘাত থামেনি। ২৮ জানুয়ারি জাকারিয়া পিন্টুর নির্বাচনি কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি পিন্টুপন্থি বাচ্চু হোসেনকে মারধর এবং ১২ ফেব্রুয়ারি আরামবাড়িয়া বাজারে ১৫ থেকে ২০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়। ২৩ মার্চ রেলগেট ও পোস্ট অফিস মোড়ে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে হাবিব গ্রুপের কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন, বিএনপি কার্যালয়ে ভাঙচুর এবং দুই পক্ষের ১৫ থেকে ২৫ জন আহত হন। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারও আহত হন।
২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ মুখোমুখি হলেও পুলিশের হস্তক্ষেপে সংঘর্ষ এড়ানো যায়। ৩০ মার্চ পৌরসভায় টেন্ডারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ এবং ২ এপ্রিল রাতে পিন্টুপন্থি ছাত্রদল নেতা ইমরান হোসেন সোহাগকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।
পরবর্তী সময়ে ২০ এপ্রিল পাকশীতে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর, ২৫ এপ্রিল মাদক-সংক্রান্ত আধিপত্যের জেরে একজন গুলিবিদ্ধ, ২৭ এপ্রিল নাজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে গুলিবর্ষণ, ৩ মে চররূপপুরে পিন্টুপন্থি লিটনকে মারধর, ৫ মে স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য রবিনকে ছুরিকাঘাত এবং ৯ জুন পিন্টু গ্রুপের ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সভাপতি আব্দুল খালেক খাঁকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটে। ৩০ জুন সলিমপুরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিদায় অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে প্যান্ডেল-চেয়ার ভাঙচুর ও খাবার নষ্ট করা হয়। ২১ জুলাই হাবিবপন্থি বিপ্লব হোসেনের ইপিজেডের ঝুট ব্যবসার দুটি ট্রাক ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থের যোগসূত্রই বিরোধকে এতটা সংঘাতময় করে তুলছে। বালুমহাল, ঝুট ব্যবসা, টেন্ডার, পরিবহন ও মাদক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে আধিপত্যের লড়াইয়ে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছেন।
এসব বিষয়ে জাকারিয়া পিন্টুর ভাই ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্যসচিব মেহেদী হাসান বলেন, ঈশ্বরদীতে একের পর এক অস্ত্রবাজি ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। তার অভিযোগ, অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার করা হলে তাদের ছাড়াতে হাবিব প্রভাব খাটান।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, তাকে অহেতুক এসব ঘটনায় জড়ানো হচ্ছে। তার দাবি, পিন্টুর চার ভাই দল থেকে বহিষ্কৃত এবং তারাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত।
ঈশ্বরদী থানার ওসি আশাদুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে কিছুটা উত্তেজনা থাকলে পুরো ঈশ্বরদীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে, তা বলা যাবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

