প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণার পর সাম্প্রতিক সংকট কাটিয়ে দেশের পোশাক কারখানাগুলোয় গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়েছে। এর ফলে উৎপাদনেও গতি এসেছে। তবে সরবরাহ না থাকা ও প্রয়োজনীয় চাপের গ্যাস না পাওয়ায় বেশ কিছু এলাকায় এখনো স্বস্তি ফেরেনি। এ কারণে পূর্ণ সক্ষমতার অর্ধেকই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে বলে দাবি উদ্যোক্তারা। পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএসহ ভুক্তভোগী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয় জানা গেছে।
প্রসঙ্গত, গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশে গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করে। ফলে রাতারাতি দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ বন্ধ হয়ে যায় এবং শিল্প-বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গৃহস্থালির রান্নায় তীব্র ভোগান্তি শুরু হয়। শিল্পকারখানাগুলোর জ্বালানির প্রধান উৎস গ্যাস। তবে সংকটের কারণে শতাধিক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেন ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে শিল্পকারখানায় গ্যাসের সরবরাহ এক-দেড় মাস আগে যে অবস্থায় ছিল, সে রকম অবস্থায় ফিরে আসবে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরে দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানার উৎপাদনে গতি ফিরলেও কিছু কিছু জায়গায় গ্যাসের পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এর মধ্যে গাজীপুরের কালিয়াকৈর লাইনে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় সেটির আওতায় থাকা কারখানগুলোর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। লাইনটি চালুর বিষয়ে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলেও অভিযোগ উদ্যোক্তাদের। এ বিষয়ে জানতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজকে ফোন দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
তবে যেসব শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ বেড়েছে সেগুলোতে উৎপাদনও বেড়েছে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক ও সাউদার্ন নিটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইমরান কাদের তূর্য গতকাল আমার দেশকে বলেন, ওভারঅল গ্যাসের অবস্থা তুলনামূলক ভালো। কিন্তু বিষয় হচ্ছে, আমাদের কালিয়াকৈরে চন্দ্রার যে গ্যাসের পাইপলাইন, ওই লাইনে কোনো গ্যাসের সরবরাহ নেই। আমার কারখানাও এই লাইনে পড়েছে, সেখানেও গ্যাস নেই। আসলে অন্যান্য জায়গায় গ্যাসের সরবরাহ থাকলেও এই লাইনে কোনোভাবেই সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে বারবার তিতাসে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান দিতে পারেনি। ফ্যাক্টরি মালিকরা সেখানে উপস্থিত হয়ে জানিয়েছেন যে, তাদের ফ্যাক্টরিতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, একদম শূন্য। তারা চেষ্টা করছে, এই লাইনগুলোয় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গ্যাস সরবরাহ করা যায়।
এদিকে গাজীপুর সদর, জয়দেবপুর, রাজেন্দ্রপুর, শ্রীপুর, মাওনা এসব এলাকায় গ্যাসের পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—ইপিলিয়ন, পারটেক্স, তালহা ফ্যাব্রিক্স, নোমান টেরিটাওয়েল মিলস। এ বিষয়ে তালহা টেক্স প্রো. লিমিটেডের পক্ষে জাবের-জোবায়ের গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক সিফাত হোসেন ফাহিম বলেন, ‘গ্যাস স্বাভাবিক হয়নি। বিশেষ করে গাজীপুরের শ্রীপুরের মিলগুলোয় গ্যাসের যৎসামান্য ইমপ্রুভমেন্টও আসেনি। প্রধানমন্ত্রীর কমিটমেন্ট ছিল গ্যাসের ওভারঅল পরিস্থিতির উন্নতি হবে—সেটা আসলে হয়নি।
এদিকে অতি সম্প্রতি দেখা দেওয়া গ্যাস সংকটে নরসিংদীর শতাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে এসব এলাকায় গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ায় উৎপাদন কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। অন্যদিকে সাভারের আশুলিয়াতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতাই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে বলে দাবি উদ্যোক্তাদের। জানতে চাইলে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিচালক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, বর্তমানে কিছু কিছু জায়গায় গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কিছুটা বেড়েছে। সার্বিকভাবে টেক্সটাইল মিলগুলোর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ফ্যাক্টরি বর্তমানে মোটামুটি গ্যাস পাচ্ছে, আর বাকি ৩০ শতাংশ ফ্যাক্টরিতে এখনো ঠিকমতো গ্যাসের সরবরাহ আসেনি। তিনি বলেন, আমার নিজের দুটি কারখানার একটি সাভারের আশুলিয়ায় এবং অন্যটি নারায়ণগঞ্জের ভুলতায়। এর মধ্যে ভুলতার কারখানায় গ্যাস পাওয়া গেলেও সাভারের কারখানার পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি ভালো হয়নি। আমাদের কারখানায় গ্যাসের চাপ যেখানে ১০ (পিএসআই) থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩। এই অতি সামান্য চাপে জেনারেটর চালুই করা সম্ভব হয় না। এছাড়া পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় সাভারের কারখানার ৭০ শতাংশ উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে, বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ উৎপাদন চালু রয়েছে।
গ্যাসের অবস্থা আগের তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, বর্তমানে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও ২১ জুলাইয়ের আগের অবস্থায় এখনো সেটি উন্নীত হয়নি। যে কারণে সক্ষমতার অর্ধেকের বেশিই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে উদ্যোক্তাদের। অবস্থার উন্নতি না হলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক ড. রশিদ আহমদ হোসাইনী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্য দিয়ে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই চাপ কোনোভাবেই ২১ জুলাইয়ের আগের চাহিদার মাত্রাকে এখনো অতিক্রম করতে পারেনি। তবে অতি খারাপ পর্যায় থেকে পরিস্থিতি আস্তে আস্তে ওপরে উঠছে।
রশিদ আহমদ হোসাইনী আরো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কারখানাগুলো একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে আপাতত রক্ষা পেলেও, বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কিন্তু কাটেনি। কোনো ফ্যাক্টরি যদি এক মাস তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের ৮০ শতাংশ উৎপাদন করতে না পারে, তবে অর্ডার বাতিল হওয়া কিংবা বিলম্বে সরবরাহের জন্য ডিসকাউন্ট দেওয়ার ফলে যে বিপুল ক্ষতি হয়, তার আসল ধাক্কা বা প্রভাব আসবে অন্তত তিন মাস পর। যেসব কারখানা এর মধ্যে টিকে থাকতে পারবে না, তাদের ওপর একটি বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।
বর্তমান গ্যাস সংকটের সার্বিক বিষয়ে বিজিএমইএর সহসভাপতি শিহাব উদ্দৌজা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, গ্যাসের বাস্তব চিত্র হলো, আগের থেকেও উন্নতি হয়েছে। এটা এখন আগের জায়গার কাছাকাছি আসছে। কিন্তু গ্যাসের যে প্রেশার ইন্ডাস্ট্রির জন্য দরকার, সেটা এখনো পুরোপুরি আসেনি। তবে যে দুরবস্থা ছিল, সেখান থেকে উন্নতি করে একটা জায়গায় এসেছি। মোটামুটি এখন চলছে, এভাবে হলেও চলবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



