রাজধানীর কাফরুলে কলেজছাত্র রাকিবুল ইসলামকে (১৭) অপহরণের পর মুক্তিপণের টাকা আদায়ের চেষ্টা করতে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হত্যার পর লাশ কার্টনে ভরে নীলফামারীর ডিমলায় নিয়ে মাটিচাপা দেয় আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার (২৪)। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যেই ডিমলা থেকে প্রায় ২০ দিন পর রাকিবের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
বুধবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এ বিষয়ে ব্রিফিং করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)’র যুগ্ম পুলিশ কমিশনার, ক্রাইম প্রিভেনশন (উত্তর) মোঃ মহিদুল ইসলাম।
পুলিশ জানায়, রাকিব পূর্ব শেওড়াপাড়ার একটি মেসে থাকতেন। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির জন্য ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে তাকে বাসার বাইরে ডেকে নেওয়া হয়। এরপর আর মেসে ফেরেননি রাকিব। নিখোঁজের পর পরিবারের কাছে ফোন ও অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে রাকিবকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে চারটি বিকাশ ও তিনটি নগদ নম্বরে মোট চার লাখ টাকা পাঠান।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে অনলাইনে রাকিবের সঙ্গে মামুনের পরিচয় হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে থেকে রাকিবকে শুক্রাবাদে নিজের বাসায় নিয়ে যায় মামুন। সেখানে মুক্তিপণের টাকা আদায়ের জন্য চাপ দেওয়ার একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। তখন মামুন রাকিবের ঘাড় মটকে দেয় বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানায়। এতে রাকিবের মৃত্যু হলে ঘটনা গোপন করতে লাশ কার্টনের ভেতর ঢুকিয়ে কসটেপ দিয়ে মুড়িয়ে ফেলে মামুন। পরে অটোরিকশায় করে সেটি গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যায়। সেখান থেকে বাস ও অন্যান্য যানবাহনে করে নীলফামারীর ডিমলায় নিজ বাড়ির এলাকায় পৌঁছায়। ১৭ সেপ্টেম্বর ডিমলায় পৌঁছে মামুন নিজের বাড়ির সামনে সুপারি বাগানে গর্ত করে। এরপর কার্টনসহ রাকিবের লাশ সেখানে মাটিচাপা দিয়ে আবার ঢাকায় ফিরে আসে।
রাকিব নিখোঁজ হওয়ার পর তার বড় ভাই জহুরুল ইসলাম জীবন প্রথমে কাফরুল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় মামলা করা হয়। নিখোঁজ শিক্ষার্থীকে উদ্ধারে তদন্তে নামে কাফরুল থানা পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মুক্তিপণ দাবিতে ব্যবহৃত দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের ব্যবহারকারী হিসেবে মামুনকে শনাক্ত করা হয়। এরপর ৫ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে শেরেবাংলা নগর থানার শুক্রাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে মামুনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিমলা থানা পুলিশের সহায়তা নেয় কাফরুল থানা পুলিশ। মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মামুনের দেখানো জায়গায় অভিযান চালানো হয়। মাটি খুঁড়ে কার্টনের ভেতর থেকে রাকিবের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে তার বড় ভাই জীবন লাশ শনাক্ত করেন। উদ্ধার করা লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামুনের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা নগদ উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে রাকিব হত্যায় আর কেউ জড়িত ছিল কি না, মুক্তিপণের পুরো অর্থের লেনদেনে কারা যুক্ত ছিল এবং হত্যার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট আরও ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য যাচাই করছে পুলিশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


