আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

চকবাজারের শাহি ইফতারির ৩০০ বছর

রঙ গন্ধ স্বাদের বর্ণিল আয়োজন

মাহমুদুল হাসান আশিক

রঙ গন্ধ স্বাদের বর্ণিল আয়োজন
রাজধানীর চকবাজারে বৃহস্পতিবার বাহারি ইফতার সামগ্রী। ছবি: রফিকুর রহমান রেকু

বসন্তে যখন শিমুলের লাল রঙ ছড়িয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই ত্যাগ ও সংযমের মহিমায় আলোকিত হয়ে এলো পবিত্র মাহে রমজান। ১৪৪৭ হিজরি সনের রমজান মাস শুরু হয়েছে মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের বার্তা নিয়ে। রমজানে অন্যান্য ইবাদতের মতো ইফতার ও সাহরিও এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ইফতারের এ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পরিণত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ইফতার উৎসবে।

সকাল থেকেই পুরান ঢাকার বাতাসে মিশে যেতে থাকে হরেক রকম মুখরোচক ইফতার সামগ্রীর সুঘ্রাণ। সারা দিন সিয়াম সাধনার পর সন্ধ্যায় ইফতার আর সে ইফতার যদি হয় ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় ভরা, খানদানি স্বাদে পরিপূর্ণ, তাহলে তা হয়ে ওঠে উৎসব আর সে উৎসবের নাম চকবাজারের শাহি ইফতারির বাজার।

বিজ্ঞাপন

এ ঐতিহ্যবাহী ইফতার বাজারের সূচনা মোগল আমলে। ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক শাহি মসজিদ। পরে ১৭০২ সালে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ চকবাজারকে একটি আধুনিক বাজারে রূপ দেন। তখন থেকেই রমজান মাসে এখানে বসতে শুরু করে মুখরোচক ইফতারির ভাসমান বাজার। সেই থেকে পথচলা। ঢাকার বয়স যখন চার শতক ছাড়িয়েছে, তখন হিসাব কষে বলা যায়, চকবাজারের ইফতারির ইতিহাসও ৩০০ বছর ছাড়িয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রমজানের প্রথমদিন সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দুপুর থেকেই বদলে যেতে থাকে শাহি মসজিদের সামনের সড়কসহ চকবাজারের চেহারা। রাস্তার মাঝ বরাবর সারি সারি অস্থায়ী টেবিল, বাঁশের কাঠামো, রঙিন সামিয়ানা। টেবিলের ওপর রান্না করা খাসি, যার দাম হাঁকাচ্ছে ১২ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। হরেক রকমের মসলা দিয়ে রান্না করা রাজহাঁস, চীনা হাঁস, দেশি হাঁসও বসিয়ে রাখা হয়েছে। যার দাম যথাক্রমে—তিন হাজার, দুই হাজার ও এক হাজার টাকা। বড় বড় শিকের সঙ্গে জড়ানো সুতি কাবাব আর জালি কাবাব স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

টিক্কা কাবাব, বিফ স্টিক, চিকেন স্টিক, কিমা পরোটা, শাহি পরোটা, টানা পরোটা, খাসির কাবাব, গরুর কাবাব—সবকিছু স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিটি দোকানে বিশাল বিশাল গামলায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে এসব। এছাড়া রয়েছে দইবড়া, হালিম, ছোলা, ঘুগনিসহ বিভিন্ন ধরনের চপ। অন্যপাশে কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি, মোরগ পোলাও, খাসির রানের রোস্ট, কবুতর ও কোয়েলের রোস্ট। মিষ্টির সারিতে চিকন জিলাপি, বড় শাহি জিলাপি, ফালুদা, ফিরনি, লাবাং, নূরানি লাচ্ছি, পনির, পেস্তা বাদামের শরবত, ছানামাঠা—সব মিলিয়ে রং, গন্ধ ও স্বাদের এক বর্ণিল আয়োজন।

মোহাম্মদ মিরাজ ৯ বছর ধরে ফালুদা, ফিরনি, পেস্তা বাদামের শরবত ও জর্দা বিক্রি করছেন। এটি তাদের বাপ-দাদার ব্যবসা। তার বাবা মোহাম্মদ সোহরাবও রমজানে এই বাজারে একই ব্যবসা করছেন। তিনি জানান, প্রতি রমজানে ঐতিহ্যগতভাবেই তারা এ বাজারে এসে ইফতারি বিক্রি করেন। কথায় কথায় বোঝা যায়, এ ব্যবসা তাদের কাছে শুধু আয়ের মাধ্যম নয়, এটি তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য।

চকবাজারে ঢুকলেই শোনা যায় কিছু বিশেষ ছড়া। এর মধ্যে ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়’, ‘ধনী-গরিব সবাই খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়’ ও ‘কিপটামি বাদ দেন, ইফতারি ঠোঙায় নেন’ বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বড়বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়—এ আইটেমটি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের প্রতীক। নামটির পেছনেও রয়েছে ব্যবসা চাঙা করার কৌশল। ডিম, গরুর মগজ, আলু, ঘি, কাঁচা ও শুকনো মরিচ, গরুর কলিজা, মুরগির মাংসের কুচি, গিলা-কলিজা, সুতি কাবাব, মাংসের কিমাসহ নানা উপাদানে তৈরি হয় এ বিশেষ মিশ্রণ।

আইটেমটি বাজারে প্রথমবার নিয়ে আসেন হারুন মিয়া—দাবি করেন তার সন্তান বিলাল শাহ। তিনি জানান, তারা বংশগতভাবে এ ইফতার বাজারে ব্যবসা করেন। বর্তমানে তিনি ব্যবসাটি ধরে রেখেছেন । বিলাল শাহর দাদা শেখ সুবাহও এ বাজারে ব্যবসা করতেন। বিলাল জানান, চকবাজারে ইফতারির বাজার বসার পর থেকেই তার পরিবার এ ইফতার উৎসবে অংশ নেন। এ বিশেষ খাবারটি তখন বটপাতার ডালায় করে বিক্রি হতো।

চকবাজারের অধিকাংশ বিক্রেতাই মৌসুমি। সারা বছর অন্য পেশায় থাকলেও রমজান এলেই ফিরে আসেন চকের আঙিনায়। বাসা থেকে খাবার তৈরি করে নির্ধারিত টেবিলে এনে সাজান। ক্রেতাদের নজরও থাকে এসব ঘরোয়া স্বাদের দিকে।

বিশাল আকৃতির শাহি জিলাপিও নজর কাড়ে ক্রেতাদের। একেকটি শাহি জিলাপির ওজন আধা কেজি থেকে শুরু করে পাঁচ কেজি পর্যন্ত। জিলাপিগুলো দেখতে যেমন সুন্দর ও সুবিশাল, খেতেও তেমন মজাদার ও সুস্বাদু বলে দাবি করেন বিক্রেতা সাইফুল ইসলাম। তিনি আমার দেশকে বলেন, আমার দাদা মোহাম্মদ রুবেলকেও আমি দেখেছি এ ব্যবসা করতে। আমার বাবা মোহাম্মদ আলীও বিক্রি করেন। এখন আমরাও করছি। প্রতি কেজির দাম ৪০০ টাকা। এছাড়া দইবড়াও ক্রেতাদের নজরে রয়েছে। আবদুল জাব্বারের দইবড়া বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত।

যাত্রাবাড়ী থেকে ইফতারি কিনতে আসা হোসনে আরা বেগম বলেন, প্রতি বছর প্রথম রমজানে এখানে আসি। পরিবারের সবাই চায় চকবাজারের ইফতারি দিয়ে ইফতার শুরু করতে। সুতি কাবাব, কোয়েল রোস্ট ও দইবড়া নিয়েছি। এছাড়া পেস্তাবাদামের শরবত নিয়েছি। তবে প্রতিবার সতর্ক থাকতে হয়। কারণ গতবার রোস্ট নিয়ে মজা পাইনি। রমজান হওয়ায় টেস্ট করার সুযোগ না থাকায় কখনো কখনো ফ্রিজের খাবার দিয়ে দেওয়া হয়। তাই প্রত্যেককে সচেতন থাকতে হবে।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ নাদিম আমার দেশকে বলেন, সময় বদলেছে, আয়োজন বেড়েছে। কিন্তু ঐতিহ্য রক্ষার্থেই আমরা এখনো অংশ নিই। প্রতি রমজানেই নিয়মিত আমরা এখান থেকে ইফতারির সবকিছু কিনি, এটাই আমাদের ঐতিহ্য।

স্বাদ, তৃপ্তি ও ঐতিহ্যে ইফতারকে পরিপূর্ণ করতেই মোগল আমল থেকে এ আয়োজন। মোগল আমলের ছোঁয়া নিয়ে যে আয়োজন শুরু হয়েছিল, তা আজও বয়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। ১৪৪৭ হিজরির প্রথম রমজান গতকাল পেরিয়ে গেছে। রমজান জুড়ে প্রতিদিন চকবাজারের অলিগলিতে ভেসে আসবে কাবাবের ধোঁয়া, জিলাপির মিষ্টি সুবাস ও হরেক রকম ইফতারির সুঘ্রাণ আর থাকবে মানুষের কোলাহল। ইতিহাস, স্বাদ ও স্মৃতির মেলবন্ধনে চকবাজার যেন প্রতি রমজানেই নতুন করে প্রমাণ করে—ঐতিহ্য শুধু অতীত নয়, এটি জীবন্ত বর্তমান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন