রাজধানীর পল্লবী এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে যুবলীগ নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. তাজুল (তাইজুল) ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পির বিরুদ্ধে প্রায় আড়াই কোটি টাকা মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন খান জানান, পরিবহন খাত, ফুটপাতের অস্থায়ী বাজার, গার্মেন্টসের ঝুট কাপড় এবং ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পিসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
মামলাটি গত ৫ মার্চ পল্লবী থানায় দায়ের করা হয়। এতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধনী-২০১৫)-এর ৪(২)/৪(৪) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
সিআইডির অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর পল্লবী–মিরপুর এলাকায় প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত তাজুল ইসলাম নিজেকে “স্মার্ট ফ্যাশন” নামে একটি পোশাক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক এবং মোরেলগঞ্জ, বাগেরহাট এলাকায় অবস্থিত “মেসার্স চৌধুরী অ্যান্ড খান অটোব্রিকস” নামে একটি ইটভাটার স্বত্বাধিকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি মোট ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫৫ টাকা আয় করেছেন বলে দাবি করেন। তার দাবি অনুযায়ী পোশাক ব্যবসা, মাছ ব্যবসা ও ইটভাটা পরিচালনা থেকে এই আয় হয়েছে। একই সময়ে তিনি পারিবারিক ব্যয় দেখিয়েছেন ১ কোটি ১১ লাখ ৮৩ হাজার ২৭০ টাকা। সে হিসেবে সম্ভাব্য সঞ্চয় দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫ টাকা।
কিন্তু সিআইডির অনুসন্ধানে তার নামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য পাওয়া গেছে প্রায় ৪ কোটি ২৭ লাখ ২২ হাজার ৪৭১ টাকা। ফলে ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাবে প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার ৩৮৬ টাকার উৎস তিনি দেখাতে পারেননি।
এছাড়া তদন্তে জানা যায়, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে অবস্থিত তার মালিকানাধীন ইটভাটাটি নিষিদ্ধ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে, যা ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী অবৈধ। এ কারণে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর ভাটাটির কার্যক্রম বন্ধের নোটিশ দেয় এবং ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবু ওই ইটভাটা থেকে প্রায় ৪৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা আয় দেখানো হয়েছে, যা অবৈধ উৎসের বলে মনে করছে সিআইডি।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পল্লবী থানাধীন উত্তর সেনপাড়া এলাকায় জমি ক্রয়ের সময় দলিলে প্রকৃত মূল্য গোপন করা হয়েছে। দলিলে জমির মূল্য ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত মূল্য ছিল প্রায় ৫৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। ফলে প্রায় ৪৮ লাখ টাকার উৎস গোপনের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত সংস্থা।
সব মিলিয়ে সিআইডির অনুসন্ধানে প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৫১ টাকা অবৈধভাবে অর্জন, স্থানান্তর ও রূপান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে মোট লেনদেনের পরিমাণ ৫৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকারও বেশি বলে জানিয়েছে সিআইডি। বর্তমানে এসব হিসাবের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৪৭১ টাকা আদালতের আদেশে জব্দ রয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, তার দুটি প্রতিষ্ঠানের ২০২৩ ও ২০২৪ সালের অডিট রিপোর্ট জাল। কারণ অডিট রিপোর্ট প্রস্তুতকারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এস. এম. জাকারিয়া করোনা মহামারির সময়ই মারা গেছেন। অথচ তার নাম ব্যবহার করে অডিট রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে সিআইডি।
সিআইডি জানায়, অর্থপাচার ও আর্থিক অপরাধ দমনে সংস্থাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে এবং এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

