“আমারে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুইটা বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি”—পায়ে লোহার ভারী শিকল, খাটের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা শরীর। পিঠের ওপর সপাটে আছড়ে পড়ছে চামড়ার বেল্ট। রক্তজমাট কালচে জখম নিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছেন ২৫ বছরের এক তরুণী মা। কিন্তু নিজের যন্ত্রণার চেয়েও নিজের মনকে আকুল করে তুলেছিল পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা সাফওয়ান (৫) ও তাসফিয়ার (৪) অবুঝ কান্না। ঘাতক স্বামীর পা ধরে কেবল সন্তানদের একটু শান্ত করার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই করুণ আকুতিতেও গলেনি পাষাণ স্বামীর মন।
রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির সেই অন্ধকার ফ্ল্যাটের ৩ মিনিটের একটি হাড়হিম করা ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইন্টারনেটে সর্বস্তরের মানুষ ও মানবাধিকারকর্মীরা ধিক্কার জানাচ্ছেন এই বর্বরতাকে। বোনকে নির্যাতনের এই রোমহর্ষক দৃশ্য ভাই তানভীর রহমানের মুঠোফোনে পাঠিয়েই ক্ষান্ত হয়নি স্বামী সোহেল শিকদার; মেসেজে লিখেছিল- ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’ কিন্তু সেই খবর পেয়ে স্বজনেরা যখন ছুটে এলেন, ততক্ষণে সব শেষ। ঘরের সিলিং ফ্যানে ঝুলছিল মুক্তার নিথর দেহ।
ঘটনার পর খিলক্ষেত থানা পুলিশ প্রধান অভিযুক্ত স্বামী সোহেল শিকদারকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তার ফোন থেকেই উদ্ধার করেছে সেই বর্বরোচিত নির্যাতনের ভিডিও প্রমাণ।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন আমার দেশ’কে বলেন, এ ঘটনায় নিহত মুক্তার ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে চারজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রধান অভিযুক্ত সোহেল শিকদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এলে সবকিছু পরিষ্কার হবে।
ভিডিওতে বন্দি এক মায়ের অসহায়ত্ব-
পুলিশের হাতে থাকা ভিডিওতে মুক্তাকে পায়ে শিকল পরানো এবং খাটের সঙ্গে আটকে রাখার দৃশ্য দেখা যায়। তাকে চামড়ার বেল্ট দিয়ে মারধর করা হচ্ছে। শরীরে আঘাতের চিহ্নও দেখা গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। নির্যাতনের একপর্যায়ে মুক্তাকে বলতে শোনা যায়, তিনি কোনো অন্যায় করেননি। স্বামীকে ভালোবাসেন বলেও তাকে বলতে শোনা যায়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি তাকে অস্থির করে তুলছিল, তা ছিল দুই সন্তানের কান্না। পাশের কক্ষে থাকা সন্তানদের কান্না শুনে মুক্তা স্বামীকে অনুরোধ করেছিলেন, অন্তত তাদের ঘুম পাড়িয়ে আসার সুযোগ দিতে। একজন নির্যাতিত নারীর নিজের কষ্ট ভুলে সন্তানদের কথা ভাবার সেই মুহূর্তটিই এখন ঘটনাটির সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ হয়ে উঠেছে। ভিডিওটি সোহেলের ফোনেও পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ফলে এটি এখন মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘বোনকে নিয়ে যাও’—বার্তা-
পুলিশ ও স্বজনদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর সোহেল ওই ভিডিও মুক্তার ভাই তানভীরের কাছে পাঠায়। বোনকে নিয়ে যেতে বলে সে। স্বজনেরা তখন মুক্তাকে ওই বাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুই দিন পর, ৩ সেপ্টেম্বর, খিলক্ষেতের ওই বাসায় গিয়ে তাঁরা দেখতে পান মুক্তা আর জীবিত নেই। পরে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তারা এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
নীরবে সহ্য করতেন মুক্তা-
মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর খিলক্ষেতে স্বামীর সঙ্গে থাকতেন তিনি। বিয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ চলছিল। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সোহেল প্রথমে মুদির দোকান করতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ব্যবসায় প্রত্যাশিত সাফল্য না আসার পর সংসারে অশান্তি বাড়তে থাকে বলে তারা দাবি করেছেন। স্বজনেরা বলছেন, নির্যাতনের অনেক কথাই মুক্তা তাদের জানাতেন না। হয়তো সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা, হয়তো সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা—অনেক কিছুই তিনি নিজের ভেতরে রেখে দিয়েছিলেন। কয়েক মাস আগে সোহেল মুক্তার ভাই তানভীরের কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন। টাকা দিতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে মুক্তাকে মারধর করা হতো। স্বজনদের আরও অভিযোগ, যৌতুকের চাপ এবং স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে—এমন সন্দেহ থেকেও মুক্তার ওপর নির্যাতন চালানো হতো।
দুই শিশুর কাছে এখন মায়ের অর্থ কী?
মুক্তার দুই সন্তান সাফওয়ান ও তাসফিয়া। একজনের বয়স পাঁচ, অন্যজনের চার বছর। এই বয়সে তারা মামলা বোঝে না। বোঝে না ময়নাতদন্ত কী, তদন্ত কী, আসামি কী। তারা শুধু বোঝে—মা নেই। আর যে শিশুদের কান্নার কথা ভেবে মুক্তা নিজের ওপর চলা নির্যাতনের মধ্যেও স্বামীকে বলেছিলেন তাদের ঘুম পাড়িয়ে আসতে, সেই শিশুরাই এখন মায়ের শূন্যতা নিয়ে বড় হবে। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানরা মাকে হারিয়ে কাঁদছে। তাদের মুখে মায়ের মৃত্যুকে ঘিরে নানা কথা শোনা যাচ্ছে বলেও পরিবার জানিয়েছে।
একটি ভিডিও, অসংখ্য প্রশ্ন-
ঘটনার সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক হলো—নির্যাতনের ভিডিওটি মৃত্যুর কয়েক দিন আগের। অর্থাৎ ভিডিও ধারণের সময় মুক্তা জীবিত ছিলেন। এরপর তিনি কী অবস্থায় ছিলেন, তার সঙ্গে কী ঘটেছিল, কখন তার মৃত্যু হয়—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভিডিওর পাশাপাশি পুলিশকে খতিয়ে দেখতে হবে মুঠোফোনের তথ্য, কল ও যোগাযোগের রেকর্ড, ঘটনাস্থলের আলামত, লাশ উদ্ধারের পরিস্থিতি এবং ময়নাতদন্তের ফলাফল। পুলিশ বলছে- এসব কিছুই তদন্তের আওতায় আসবে। মুক্তাকে নির্যাতনের ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ ও নিন্দা দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি ভিডিওটি পুনরায় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি বলে অভিজ্ঞরা বলছেন। এতে দুই শিশুর ব্যক্তিগত কষ্ট আরও প্রকাশ্যে চলে আসতে পারে এবং ভুক্তভোগীর মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হতে পারে।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


