ডেঙ্গু ও হামসহ জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসা ও মশক নিধনের ওপর নির্ভর না করে পরিকল্পিত নগরায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটি বলেছে, নগরের জনঘনত্ব, ভূমি ব্যবহার, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাশয় ও নির্মাণস্থলের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই ডেঙ্গু-হাম ঠেকাতে পরিকল্পিত নগরায়নের বিকল্প নেই।
শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘হাম ও ডেঙ্গু: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগর পরিকল্পনার ভূমিকা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধে বিআইপির সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের শহরগুলোতে ডেঙ্গু, হাম, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, নগর তাপদাহ ও অনিরাপদ পানির মতো জনস্বাস্থ্য সংকট বাড়ছে। এসব সংকট মোকাবিলায় চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নগরের অবকাঠামো, পরিবেশ ও ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট, লিফটের গর্ত ও ছাদে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তাই ভবন নির্মাণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় পানি জমা প্রতিরোধ এবং নির্মাণস্থলে নিয়মিত লার্ভা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, নগরায়ন, জনঘনত্ব ও দারিদ্র্য বেশি এমন এলাকায় হাম ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। উন্নয়ন প্রকল্পে হেলথ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (এইচআইএ) অন্তর্ভুক্ত করলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব।
বিআইপির সহ-সভাপতি শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য সমন্বয়ের জন্য ইউনিফাইড তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলে তা জিআইএসের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগর পরিকল্পনার কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে ১০ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে— ভূমি ব্যবহার ও জোনিং: আবাসিক, শিল্প, খোলা জায়গা ও জলাধারের সুনির্দিষ্ট ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত এবং বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ও জলাশয় সংরক্ষণ করা; Health Impact Assessment (HIA): বড় নগর প্রকল্প ও পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য প্রভাব মূল্যায়ন বা স্বাস্থ্য-সংবেদনশীল স্ক্রিনিং অন্তর্ভুক্ত করা; নিষ্কাশন ও পানি ব্যবস্থার সমন্বয়: ড্রেনেজ, জলাধার, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা; তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ: ডেঙ্গু, হাম, জলাবদ্ধতা, টিকা কভারেজ, জনঘনত্ব ও তাপঝুঁকির তথ্য GIS-এর মাধ্যমে একত্রিত করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা; অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা: নিম্ন আয়ের ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান সুবিধা সহজলভ্য করার জন্য স্থানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা; পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি: পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, অগ্রগতি মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা; দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য বিবেচনা: ফুটপাত, পার্ক, হাঁটার উপযোগী পরিবেশ এবং সবুজ-নীল অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা; ডেঙ্গু প্রতিরোধে নির্মাণস্থল ব্যবস্থাপনা: নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট, লিফটের গর্ত ও ছাদে পানি জমা প্রতিরোধ এবং নিয়মিত লার্ভা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা; হাম প্রতিরোধে স্থানভিত্তিক টিকাদান পরিকল্পনা: জনঘনত্ব, শিশুদের সংখ্যা, টিকা কভারেজ ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের অবস্থান বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ টিকাদান কার্যক্রমের স্থান নির্ধারণ করা; GIS-ভিত্তিক জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা: জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্থানিক তথ্য সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অগ্রাধিকারভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


