নগর উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক সেবা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোকে নাগরিক পদক-২০২৫ প্রদান করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
রোববার রাজধানীর গুলশানে ডিএনসিসির নগর ভবনে এসব ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য আটটি ক্যাটাগরিতে আট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এ পদক দেওয়া হয়।
পদক প্রদান অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, লেখক ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী, ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মাহমুদুল হাসান উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।
উদ্ভাবক ও স্টার্ট-আপ ক্যাটাগরিতে আবদুর রশিদ সোহাগ; ব্যক্তি উদ্যোগ ক্যাটাগরিতে শ্রুতি রানী দে; সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট নির্মাণ ক্যাটাগরিতে আপলিফট বাংলাদেশ; পরিবেশবান্ধব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে ভাষানটেক স্কুল এন্ড কলেজ; সামাজিক সংগঠন ক্যাটাগরিতে উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি; প্রাণী সুরক্ষা ও প্রাণী অধিকার রক্ষা ক্যাটাগরিতে প ফাউন্ডেশন (পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফার ফাউন্ডেশন); অ্যাডভোকেসি ক্যাটাগরিতে হাওয়া বেগম এবং সর্বোচ্চ করদাতা ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড পুরস্কার পেয়েছে। পুরস্কার হিসেবে বিজয়ীদের পদক, সনদ, সম্মাননা স্মারক ও অর্থ প্রদান করা হয়।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্তৃপক্ষ জানায়, উদ্ভাবক ও স্টার্টআপ ক্যাটাগরিতে আবদুর রশিদ সোহাগ পিউপিল স্কুল বাস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত মহানগরে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এই সেবায় ৪৫টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন যাতায়াত করছে। এর ফলে একদিকে অভিভাবকদের উদ্বেগ কমেছে, অন্যদিকে নগরীর রাস্তায় শত শত ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমেছে।
ব্যক্তি উদ্যোগ ক্যাটাগরিতে পদক পাওয়া শ্রুতি রানী দে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাজ ও নগরের কল্যাণে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি নিজ উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন এবং প্রতি সপ্তাহে এলাকাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নগরের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন। একই সঙ্গে তিনি প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টি ও এর যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নিয়মিত কাজ করছেন। নিজ এলাকায় তিনি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে ১২টি বাল্যবিবাহ বন্ধে সফল হয়েছেন এবং বর্তমানে শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের পুনরায় স্কুলে ফেরানোর উদ্যোগে কাজ করে যাচ্ছেন।
সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট নির্মাণ ক্যাটাগরিতে আপলিফট বাংলাদেশ পাঁচ বছর ধরে উন্নয়নভিত্তিক কনটেন্ট বানাচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটির আওতাধীন এলাকাগুলোর ক্রমাগত পরিবর্তন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং যোগাযোগব্যবস্থার অগ্রগতিকে নিয়মিত ও দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরা তাদের কনটেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দিক।
পরিবেশবান্ধব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে পদক পাওয়া ভাষানটেক স্কুল এন্ড কলেজ ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করে। স্কুলটি কেবল শিক্ষাদানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পরিবেশ সচেতনতা বিকাশে ধারাবাহিকভাবে ভূমিকা রেখে চলেছে। পরিবেশ সংরক্ষণকে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার অংশ হিসেবে গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে পরিবেশবান্ধব নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আসছে।
সামাজিক সংগঠন ক্যাটাগরিতে পদক পাওয়া উত্তরা পাবলিক লাইব্রেরি জ্ঞানচর্চা, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিক সংস্কৃতি বিকাশে একটি ব্যতিক্রমী এবং অনুকরণীয় সামাজিক সংগঠন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এই গ্রন্থাগারে নিয়মিতভাবে কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা, জুলাই চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ভাষা দিবসের রচনা প্রতিযোগিতা, বিজয় দিবস উপলক্ষে আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
প্রাণী সুরক্ষা ও প্রাণী অধিকার রক্ষা ক্যাটাগরিতে পদক পাওয়া প ফাউন্ডেশন (PAWF) শহরের আহত ও বিপন্ন প্রাণী উদ্ধার করে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, প্রাণী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে একটি মানবিক ও সহনশীল নগর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
অ্যাডভোকেসি ক্যাটাগরিতে হাওয়া বেগম নগরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, জীবনমান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০০৭ সালের সিডরে সবকিছু হারিয়ে তিনি ঢাকায় এসে কড়াইল বস্তিতে বসবাস শুরু করেন। নিজ জীবনের অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে পরিণত করে তিনি বস্তিবাসীর নানা সমস্যা ও চাহিদা তুলে ধরতে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমে সক্রিয় হন। নগর কৃষি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ওয়াশ (WASH) কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
আর সর্বোচ্চ করদাতা ক্যাটাগরিতে নগর উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় রাজস্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ, গত অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৯ লক্ষ ৬৭ হাজার টাকা কর পরিশোধের মাধ্যমে সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে অবদান রাখায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে সর্বোচ্চ করদাতা ক্যাটাগরিতে নাগরিক পদক প্রদান করা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

