আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে চরম ঝুঁকিতে নগরবাসী

মাহমুদা ডলি

ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে চরম ঝুঁকিতে নগরবাসী

রাজধানীর অন্তত অর্ধশতাধিক এলাকার সড়ক ও অলিগলিতে ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। ফলে নগরবাসীকে পথ চলতে হয় ঝুঁকি নিয়ে। এসব জায়গায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। বলতে গেলে ঢাকনাহীন এসব ম্যানহোল মরণফাঁদে রূপ নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ভবঘুরে কিংবা মাদকসেবীরা ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করে নিয়ে যায়। এভাবে শুধু ঢাকা দক্ষিণ সিটিতেই বছরে প্রায় চার কোটি টাকার ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়।

রাজধানীতে মূলত ম্যানহোল স্থাপন ও তদারকির দায়িত্ব পালন করে থাকে সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসা। স্যুয়ারেজের ম্যানহোল বসায় ঢাকা ওয়াসা। আর স্টর্ম স্যুয়ারেজের (পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা) ম্যানহোল স্থাপন করে সিটি করপোরেশন। এছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তর ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষেরও অল্পস্বল্প ম্যানহোল রয়েছে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে ৭৫ হাজারের মতো ম্যানহোল রয়েছে। এর মধ্যে ১০ শতাংশ ম্যানহোল সব সময় ঢাকনাবিহীন থাকে বলে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলরাই স্বীকার করেন।

বিজ্ঞাপন

ঢাকার দুই সিটি করপোরশেনের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, চোর বা মাদকসেবীরা ম্যানহোলের দামি ঢাকনা চুরি করে ভাঙারির দোকানে ২০০ টাকায় বিক্রি করে দেয়। ঢাকনার নিরাপত্তা দেওয়া সিটি করপোরেশনের পক্ষে সম্ভব না। এ ক্ষেত্রে পুলিশ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে।

এদিকে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির ঘটনায় সিটি করপোরেশন কিংবা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে কিনা এমন তথ্য জানতে রাজধানীর বেশ কয়েকটি থানায় যোগাযোগ করা হয়। সেখানকার দেওয়া তথ্যমতে, এ নিয়ে অর্ধ শতাধিক মামলা রয়েছে। তবে এ নিয়ে গ্রেপ্তারের সংখ্যা খুবই নগণ্য।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে জনপথের মোড় পর্যন্ত প্রতি ৫০০ গজের মধ্যে তিন থেকে চারটি ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আরকে মিশন রোড থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনের গলির রাস্তাগুলোতে ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। মগবাজার চৌরাস্তা থেকে মৌচাক পর্যন্ত ম্যানহোলগুলো ঢাকনাহীন অবস্থায় রয়েছে। এসব স্থানে বাঁশের খুঁটিতে লাল কাপড় বেঁধে রাখা হয়েছে। মীর হাজীরবাগ সিটি মার্কেটের বাগিচা মসজিদসংলগ্ন সড়কের ম্যানহোলের ঢাকনাও উধাও হয়েছে। খোলা ম্যানহোলে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ছে অটোরিকশা ও সিএনজি। একই এলাকার চৌরাস্তা সিটি মার্কেটের সামনের সড়ক, মীর হাজীরবাগ মাদরাসা রোডের ৩০০ মিটার সড়ক থেকেও উধাও হয়েছে চারটি ম্যানহোলের ঢাকনা। শ্যামপুরের ঘুণ্টিঘর মোড়ের ম্যানহোলের মুখও দীর্ঘদিন ধরে খোলা। এ সড়কে প্রতিদিন জুরাইন থেকে দয়াগঞ্জগামী অসংখ্য গাড়ি যাতায়াত করে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

ম্যানহোলের ঢাকনা নেই সেগুনবাগিচার বেশ কয়েকটি গলিতেও। এর মধ্যে জিটিভির গলির শুরুতেই খোলা পড়ে আছে একটি ম্যানহোল। একইভাবে জিটিভির পেছনের গলিতেও ঢাকনাহীন ম্যানহোলের দেখা মেলে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পশ্চিম পাশের গলিতেও দীর্ঘদিন ধরে ঢাকনাহীন রয়েছে একটি ম্যানহোল। এছাড়া সেগুনবাগিচায় কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পশ্চিম পাশের গলির ম্যানহোলেরও ঢাকনা উধাও হয়েছে। শুধু তাই নয়, গুলিস্তানের মতো ব্যস্ততম এলাকায়ও অনেক ম্যানহোলের ঢাকনা গায়েব। কামরাঙ্গীরচরের আশরাফাবাদ মেইন রোডে নতুন কুড়ি শিক্ষালয় কিন্ডারগার্টেনের সামনে, টিকাটুলির অভয়দাস লেনে, অভয়দাস লেনের মুরাদ সড়কে, ধলপুর তিন রাস্তার মোড় মাতৃসদনের সামনের সড়ক, আরকে মিশন রোড ও গোপীবাগের আব্বাস মেডিসিন সেন্টারের সামনের সড়ক, খিলগাঁও থানার ৭৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম নন্দিপাড়া ও মধ্য নন্দিপাড়ার বেশিরভাগ ম্যানহোলেই ঢাকনা নেই।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় সংঘবদ্ধ চোরচক্র ও এলাকার নেশাগ্রস্তরা এসব ঢাকনা চুরি করছে। ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকায় প্রতিনিয়তই বিভিন্ন সড়কে ছোট-খাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। চুরি যাওয়া ঢাকনাগুলো পুনঃস্থাপন করা হলেও আবার চুরি হয় যায়। এতে পথচারীদের চলাচলে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রাজধানীর মুগদাপাড়া পুরোনো কাঁচাবাজার সড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত একটি সড়ক। এ রাস্তায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু সড়কের মাঝখানে ম্যানহোলে ঢাকনা নেই প্রায় দুই মাস ধরে। এ কারণে প্রায়ই পথচারী ও যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এ ম‌্যানহোল মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। গত শুক্রবার সকালে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কটিতে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। ম্যানহোলে ঢাকনা না থাকায় সেটি ভেঙে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা পান্না বেগম জানান, সড়কটি উঁচু হওয়ায় দূর থেকে গর্তটি ঠিকমতো দেখা যায় না। দুই মাসে অনেক যানবাহন এ গর্তে পড়েছে। আহত হয়েছেন অনেক পথচারী।

স্থানীয়রা জানান, সড়কটি সম্প্রতি সংস্কার করা হয়েছে। ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে এর সংস্কার করে ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু তারা ম্যানহোলের ঢাকনা লাগায়নি। ম্যানহোলের চারপাশ ভেঙে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।

ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির সত্যতা স্বীকার করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ আমার দেশকে বলেন, ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির বিষয়টি সত্য। আমি নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে অনেক জায়গায় এ অবস্থা দেখেছি। শুধু ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি নয় ল্যাম্পপোস্টের তার পর্যন্ত কেটে নিয়ে যায় চোররা। আমরা প্রতিনিয়ত যেখানে খবর পাচ্ছি সেখানেই নতুন ঢাকনা স্থাপনের ব্যবস্থা করছি। আমরা এ নিয়ে থানায় জিডি করেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে সেই অভিযোগও দিয়েছি। ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি নিয়ে অন্তত ৫০টি জিডি করা আছে থানায়।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহমুদুল হাসান আমার দেশকে বলেন, আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে চুরি রোধ করতে বিকল্প খুঁজে বের করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, বছরে প্রায় চার কোটি টাকার ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হচ্ছে শুধু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি)। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নানা দুর্ঘটনায় পড়ছে রাজধানীবাসী। এরই মধ্যে ৬৬ ও ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডে বসানো হচ্ছে ফাইবারের তৈরি ম্যানহোলের ঢাকনা। যা চুরি করলেও বিক্রি করতে পারবে না। লোহার মতোই চাপ নিতে সক্ষম ফাইবারের এসব ঢাকনা। যা বানানোর খরচ লোহার চেয়ে অনেক কম। ফাইবারের এই ঢাকনা বুয়েট টেস্টে মানোত্তীর্ণ হয়েছে। এখন থেকে এই ঢাকনা বসানোর চিন্তা করছে সিটি করপোরেশন।

ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, যখনই কেউ বুঝবে এটা প্লাস্টিকের, বিক্রি করা যায় না। তখন এটা চুরির প্রবণতা কমে যাবে। এখন প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঢাকনা চুরি হয়ে যাচ্ছে। এটা কমানো সম্ভব হবে। তিন ক্যাটাগরির ফাইবারের ঢাকনা তৈরি করবে ডিএসসিসি। ফুটপাতের জন্য ৫-১০ টনের, অলিগলির জন্য ১৫ থেকে ২০ টনের এবং প্রধান সড়কে চাপ নিতে পারবে ২৫-৩০ টনের এমন ঢাকনা তৈরি করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন