মিরপুরে ইউসুফ হত্যার সঙ্গে জড়িত বিএনপি নেতা জনি

মিরপুরে ইউসুফ হত্যার সঙ্গে জড়িত বিএনপি নেতা জনি

রাজধানীর মিরপুর-১৩ এলাকায় যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নতুন মোড় নিয়েছে । ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু অভিযোগ করেছেন, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী একই থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির দেওয়ান জনি। তার দাবি, আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে তার সম্ভাব্য প্রার্থিতা ঠেকাতেই ভাড়াটে খুনি দিয়ে হামলার পরিকল্পনা করা হয়। প্রায় ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ওই খুনিদের ভাড়া করা হয় বলে তিনি জানান। গতকাল বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স ইউনিটি (ক্র্যাব) মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে বাবু এ অভিযোগ করেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপি নেতা জনি বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে হেয় করতেই তাকে এ ঘটনায় জড়ানোর চেষ্টা চলছে। একদিকে ডিবির তদন্তে উঠে আসা তথ্য, অন্যদিকে হামলার লক্ষ্য ছিলেন বলে দাবি করা যুবদল নেতার অভিযোগ—দুই ভিন্ন বয়ানে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

জনি আমার দেশকে বলেন, যারা কিলিং মিশনে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে কোনো রকম ব্যাঘাত ঘটুক এমন কথা বলা উচিত নয় বলে তিনি জানান। রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্যই তাকে এ ঘটনার সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের সঙ্গে আমার ছবি থাকায় আমাকে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। রাজনীতি করার কারণে অনেকের সঙ্গেই আমার ছবি আছে, কিন্তু আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। তিনি জানান, সংবাদ সম্মেলন করে খুব শিগগির এ ব্যাপারে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করবেন।

হামলার লক্ষ্য ছিলেন বাবু

সংবাদ সম্মেলনে বাবু বলেন, গত শুক্রবার রাতে মিরপুর-১৩ নম্বর এলাকায় তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি অতর্কিত গুলি চালায়। হামলায় যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী নিহত হন। পাশাপাশি দুই ফুটপাত ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত এবং লক্ষ্যবস্তু ছিলেন তিনি নিজেই। বাবুর দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছিল। কারণ স্থানীয় রাজনীতিতে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে সম্ভাব্য প্রার্থিতা একটি পক্ষ মেনে নিতে পারেনি।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাই মূল কারণ

বিএনপি নেতা জনি ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী বলে দাবি করেন বাবু। তিনি বলেন, হত্যার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান জনি দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় একটি মার্কেটের গ্যারেজ অবৈধভাবে ‘সিএনজি হাফিজ’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল। সে স্থান থেকেই কিলিং মিশনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মার্কেট পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে জনি বিষয়টি জানতেন।

২৫ লাখ টাকায় ভাড়াটে খুনি

প্রায় ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে এ হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে বাবু দাবি করেন। তাকে হত্যার জন্য ঢাকার বাইরে থেকে পেশাদার অস্ত্রধারীদের আনা হয়। এছাড়া হামলা পরিচালনায় ‘সিএনজি হাফিজ’ নামে পরিচিত ব্যক্তির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এ সময় কয়েকজন সন্দেহভাজন হামলাকারীর সঙ্গে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা জনির একাধিক ছবি প্রদর্শন করেন তিনি। বাবু প্রশ্ন রেখে বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে জনির প্রকাশ্য যোগাযোগের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাকে এখনো কেন জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

ডিবির বক্তব্য প্রত্যাখ্যান

ঘটনার পর গত সোমবার মিন্টো রোডের মিডিয়া সেন্টারে ব্রিফিংয়ে ডিবি পুলিশ জানায়, স্থানীয় আধিপত্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার টেন্ডার, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা এবং ফুটপাতকেন্দ্রিক বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তদন্তে আরো দাবি করা হয়, মূল লক্ষ্য ছিলেন হাফিজুল ইসলাম বাবু, কিন্তু গুলিতে নিহত হন যুবদলকর্মী ইউসুফ। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার জন্য বাইরে থেকে ভাড়াটে শুটার আনা হয়েছিল এবং এ ঘটনায় আটজন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে যুবদল নেতা বাবু এসব বক্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন’ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, মিরপুর-১৩ এলাকায় তার কোনো ডিশ ব্যবসা, ইন্টারনেট সিন্ডিকেট কিংবা ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। এমনকি সংশ্লিষ্ট এলাকায় এখনো সিটি করপোরেশনের কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা টেন্ডারও আহ্বান করা হয়নি। ফলে তদন্তকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতোমধ্যে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্তকারীরা আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করেছেন এবং হামলার পরিকল্পনা, অর্থের উৎস ও নির্দেশদাতাদের ভূমিকা নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। ডিবি বলছে, তদন্ত এখনো চলমান। নতুন কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে যার সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলবে, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

যারা আন্দোলনের সময় মাঠে ছিল, তাদের সরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে জানিয়ে বাবু নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মাঠে সক্রিয় নেতাদের সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি গোষ্ঠী সশস্ত্র হামলার পথ বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।

সবশেষে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিতের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে হামলার নির্দেশদাতা, অর্থদাতা এবং পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। এদিকে এ ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তীব্র হয়েছে। একদিকে ডিবির তদন্তে উঠে আসা তথ্য, অন্যদিকে হামলায় বেঁচে যাওয়া নেতার প্রকাশ্য অভিযোগ—দুই ভিন্ন বর্ণনা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে প্রকৃত ঘটনা জানতে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন