একসময় বিলাসবহুল ও বিশালাকৃতির যাত্রী বিমানের প্রতীক ছিল এয়ারবাস এ৩৮০। দুই তলা কেবিন, প্রশস্ত আসনব্যবস্থা, স্থিতিশীল উড্ডয়ন এবং বিলাসবহুল সেবার কারণে যাত্রীদের কাছে এটি ছিল বিশেষ আকর্ষণের। কিন্তু বাড়তে থাকা রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি ব্যয় এবং আরো সাশ্রয়ী আধুনিক উড়োজাহাজের উত্থানে ধীরে ধীরে অস্তমিত হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম যাত্রী বিমানগুলোর একটি।
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা কোয়ান্টাস জানিয়েছে, তারা ২০২৮ সাল থেকে তাদের বহরে থাকা ১০টি এ৩৮০ অবসরে পাঠানো শুরু করবে। এর আগে ২০৩২ সাল পর্যন্ত বিমানগুলো চালানোর পরিকল্পনা ছিল। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের চার বছর আগেই সুপারজাম্বো বিমানগুলোকে বিদায় জানাতে যাচ্ছে কোয়ান্টাস।
বিমান চলাচল বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মাত্র ১৭১টি এ৩৮০ যাত্রীসেবায় রয়েছে। ২০১০-এর দশকের শেষ দিকে এই সংখ্যা ২৩০টির বেশি ছিল। নতুন অর্ডার না থাকায় ২০২১ সালে এ৩৮০-এর উৎপাদন বন্ধ করে দেয় নির্মাতা এয়ারবাস।
করোনার ধাক্কা সামলেও টিকতে পারল না
কোভিড-১৯ মহামারির সময় আকাশপথে যাত্রী চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেলে অনেকেই মনে করেছিলেন, এ৩৮০-এর যুগ শেষ। বড় ও বেশি জ্বালানি খরচের এই বিমানকে বাদ দিয়ে তুলনামূলক ছোট, দীর্ঘপাল্লার ও জ্বালানিসাশ্রয়ী উড়োজাহাজের দিকে ঝুঁকবে এয়ারলাইনগুলো—এমন ধারণাই তখন জোরালো হয়েছিল।
তবে বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন হয়। নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ সরবরাহে এয়ারবাস ও বোয়িং-এর বিলম্ব এবং যাত্রী চাহিদা দ্রুত ফিরে আসায় এ৩৮০ আবার আকাশে ফিরতে শুরু করে। লুফথানসাসহ কয়েকটি এয়ারলাইন মহামারির সময় অবসর দেওয়া বিমানও পরবর্তী সময়ে পুনরায় চালু করে।

কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। এ৩৮০ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুচরা যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ সরবরাহের ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশাল আকারের এই বিমান পরিচালনায় জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি।
কোয়ান্টাস ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ফ্রেইটের প্রধান নির্বাহী ক্যাম ওয়ালেস বিনিয়োগকারীদের বলেছেন, ২০২১ সাল থেকেই বিমানটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে এবং ভবিষ্যতে সরবরাহ-সংক্রান্ত সংকট আরো বাড়তে পারে।
কেন এত জনপ্রিয় ছিল এ৩৮০?
এ৩৮০-এর প্রতি যাত্রী ও বিমানপ্রেমীদের আলাদা টান রয়েছে। ৫০০-র বেশি যাত্রী বহনে সক্ষম বিশাল এই বিমানটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলো এর পূর্ণ দুই তলা কেবিন।
অন্যান্য বাণিজ্যিক বিমানের তুলনায় এ৩৮০-এ উড্ডয়ন অনেক বেশি স্থিতিশীল ও আরামদায়ক বলে মনে করেন অনেক যাত্রী। ওপরের ডেকে ওঠার অভিজ্ঞতা এবং বিশাল কেবিনের খোলামেলা অনুভূতিও যাত্রীদের কাছে এটিকে বিশেষ করে তুলেছে।

মেলবোর্নের বাসিন্দা ও কোয়ান্টাসের নিয়মিত যাত্রী সেবাস্তিয়ান বার্নি বলেন, এ৩৮০ তার সবচেয়ে পছন্দের বিমান। অন্য বিমানের তুলনায় এতে জায়গা বেশি খোলামেলা মনে হয় এবং যাত্রাও তুলনামূলক মসৃণ।
শুধু যাত্রী নয়, বিমানপ্রেমী বা ‘প্লেনস্পটার’দের কাছেও এ৩৮০ ছিল অন্যতম আকর্ষণ। আকাশে এত বড় একটি উড়োজাহাজের উড্ডয়ন বা অবতরণের দৃশ্য এখনো অন্য কোনো বাণিজ্যিক বিমান সহজে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।

শেষ পর্যন্ত কি শুধু এমিরেটসের বিমান হয়েই থাকবে?
বিমান মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, এ৩৮০-এর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এমিরেটসের ওপর। এ৩৮০-এর সবচেয়ে বড় অপারেটর এমিরেটস। বর্তমানে তাদের বহরে ১০১টি এ৩৮০ সক্রিয় রয়েছে এবং আরো ১৫টি সংরক্ষিত অবস্থায় আছে। দুবাইয়ের বিশাল বিমানবন্দরকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কে এ৩৮০ পরিচালনার জন্য আলাদা অবকাঠামোও গড়ে তুলেছে সংস্থাটি।
সিরিয়ামের গ্লোবাল হেড অব এয়ারক্রাফট ভ্যালুয়েশন জর্জ দিমিত্রফের মতে, এ৩৮০-এর ব্যবহারকে মূলত ‘এমিরেটস বনাম বাকি বিশ্ব’—এই দুই ভাগে দেখা যায়। যেসব এয়ারলাইন অল্পসংখ্যক এ৩৮০ পরিচালনা করে, তারা সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ ও বেশি যাত্রীসমৃদ্ধ রুটে বিমানটি ব্যবহার করে। ফলে তাদের জন্য বিমানটি ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে। তার ধারণা, শেষ পর্যন্ত এ৩৮০ হয়তো এমিরেটসের হাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।
তবে এমিরেটসের পরিকল্পনা আরো দীর্ঘমেয়াদি। সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট টিম ক্লার্ক জানিয়েছেন, তারা ২০৪০-এর দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত এ৩৮০ পরিচালনা করার পরিকল্পনা করছে। এজন্য বিদ্যমান বিমানগুলোর কেবিন আধুনিকায়ন ও নতুন প্রযুক্তি সংযোজনে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
লুফথানসাসহ অন্যদের বহরেও থাকছে এ৩৮০
সব এয়ারলাইন অবশ্য এখনই এ৩৮০ ছাড়ছে না। জার্মানির লুফথানসার বহরে বর্তমানে আটটি এ৩৮০ রয়েছে। একসময় সংস্থাটি বিমানগুলো স্থায়ীভাবে অবসরে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু নতুন প্রজন্মের বিমানের সরবরাহে বিলম্বের কারণে পরে সেগুলো আবার সেবায় ফিরিয়ে আনা হয়।
বর্তমানে লুফথানসা তাদের এ৩৮০-এর বিজনেস ক্লাস স্যুট ও ইন-ফ্লাইট বিনোদন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা ২০৩০-এর দশকের অনেকটা সময় পর্যন্ত এ৩৮০ পরিচালনা করতে চায়।
সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এবং অল নিপ্পন এয়ারওয়েজের মতো কয়েকটি এয়ারলাইনও আপাতত এ৩৮০ অবসরের তেমন কোনো পরিকল্পনা করছে না। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের ভাষায়, তাদের এ৩৮০ এখনো যাত্রীদের অন্যতম জনপ্রিয় বিমান। ফলে লন্ডন, মিউনিখ, দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বড় বড় বিমানবন্দরে আরো কয়েক বছর এ৩৮০-এর দেখা মিলবে।
বদলে যাচ্ছে আকাশপথের বিলাসিতা
এ৩৮০-এর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল এর বিলাসবহুল কেবিন। মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনগুলো এই বিমানকে ব্যবহার করে আকাশপথের বিলাসিতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছিল।
এমিরেটস এ৩৮০-এ চালু করেছিল আকাশে প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের জন্য গোসলের ব্যবস্থা। আবুধাবিভিত্তিক ইতিহাদ এয়ারওয়েজ চালু করেছিল ‘দ্য রেসিডেন্স’—তিন কক্ষের ব্যক্তিগত বিলাসবহুল জায়গা, যার সঙ্গে ছিল আলাদা ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বিলাসবহুল বিমানভ্রমণের ধারণা। এয়ার ফ্রান্স, জাপান এয়ারলাইনস ও লুফথানসাসহ বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইন প্রথম ও বিজনেস ক্লাসে ব্যক্তিগত স্যুট, উন্নতমানের আসন ও আরো বেশি ব্যক্তিগত জায়গা দিতে শুরু করেছে। ফলে এ৩৮০-এর বিশাল আকার আর আগের মতো একচেটিয়া সুবিধা এনে দিচ্ছে না।
কোয়ান্টাসও এ৩৮০-এর জায়গায় নতুন এয়ারবাস এ৩৫০-১০০০ আনার পরিকল্পনা করছে। নতুন বিমানগুলোতে প্রথম শ্রেণি, বিজনেস ক্লাস ও প্রিমিয়াম ইকোনমি আসনের অনুপাত এ৩৮০-এর তুলনায় বেশি থাকবে।

এর অর্থ হলো—বিলাসবহুল ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক যাত্রীরা আরো ভালো সুবিধা পাবেন, কিন্তু ইকোনমি শ্রেণির আসন কমে যাওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের জন্য ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে।
প্রযুক্তির বিস্ময় ও বাণিজ্যিক সাফল্য
বিমানশিল্প বিশ্লেষক হেনরি হার্টেভেল্টের মতে, আধুনিক এয়ারলাইনগুলো এখন গৌরব বা মর্যাদার জন্য বিমান পরিচালনা করে না; তাদের মূল লক্ষ্য মুনাফা। তিনি বলেন, এ৩৮০ নিঃসন্দেহে প্রযুক্তিগত বিস্ময় হলেও এয়ারবাসের জন্য এটি বাণিজ্যিকভাবে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। নতুন প্রজন্মের জ্বালানিসাশ্রয়ী ও দীর্ঘপাল্লার বিমান বাজারে আসার পর এয়ারলাইনগুলো বুঝতে পারছে—বড় বিমান সবসময় বেশি লাভজনক নয়।
বোয়িং৭৪৭ -এর মতো এ৩৮০-এর বিদায়ও তাই একদিনে হবে না। বরং একটি একটি করে এয়ারলাইন তাদের বহর থেকে বিমানটি সরিয়ে নেবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০-এর দশকের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ে এ৩৮০ কার্যত এমিরেটসকেন্দ্রিক থাকবে।
সূত্র: সিএনএন
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


