উচ্চ আদালত ও সারা দেশে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীদের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রাষ্ট্রের হয়ে লড়া এসব আইন কর্মকর্তার বড় একটি অংশের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় অসততা, প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের পক্ষে, কিন্তু গোপন সমঝোতায় আসামিপক্ষকে সহযোগিতা করার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া নৈতিক দৃঢ়তা, পেশাদারিত্ব না থাকা এবং প্রশিক্ষণের অভাবও দেশের সরকারি আইনি সার্ভিসকে যেনতেন বিষয়ে পরিণত করেছেন তারা। এ কারণে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় এবং পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস পরিণত হয়েছে দলীয় পুনর্বাসন কেন্দ্রে। এতে করে সরকারি স্বার্থ কিছুটা রক্ষা হলেও রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জনমনে বিচার বিভাগ সম্পর্কে ব্যাপক নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।
অস্থায়ী রাজনৈতিক নিয়োগ হওয়ার সুবাদে নিযুক্ত সবাই সীমিত সময়ে যে যার আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে রাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার জন্য নিয়োগ পরিণত হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য সাধনে। দীর্ঘদিন চলে আসা এ অব্যবস্থাপনা থেকে উত্তরণে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন সুপারিশ ঝুলে আছে মন্ত্রণালয়ে।
গত ৫ জুলাই বিভিন্ন অনিয়ম-অসদাচরণের কারণে খোদ অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল চার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে (ডিএজি) শোকজ করার ঘটনায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। এদিন ডিএজি জহিরুল ইসলাম সুমন, রফিকুল ইসলাম মন্টু, মুহাম্মদ মাসুদ রানা ও আশিকুজ্জামান নজরুলকে গুরুতর অসদাচরণ, সরকারি কাজে বাধা, এমনকি অ্যাটর্নি জেনারেলকে হুমকির দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। এ কারণে তাদের শোকজ করা হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি জিআর ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে যিনি অভিযোগ নিয়ে থানায় যান, তিনি কেবল এজাহারকারী বা সাক্ষী হিসেবে থাকেন । এ ক্ষেত্রে মূল বাদী হয় রাষ্ট্র। এসব মামলার প্রতিনিধিত্ব করেন পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকারি পিপি। এজন্য সরকার পাবলিক প্রসিকিউটরকে সম্মানী দেয়। এর বাইরে বাদী-বিবাদী কারো কাছ থেকেই পিপির টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই, কিন্তু এ নিয়ম শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ।
একই অভিযোগ রয়েছে উচ্চ আদালতের ক্ষেত্রেও। রাষ্ট্রের হয়ে লড়া এসব আইন কর্মকর্তার বড় একটি অংশের বিরুদ্ধেই রয়েছে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। রাতারাতি তাদের বিপুল বিত্তবৈভব অর্জন ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিলেও তারা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। আবার এদের অনেকের নিয়োগ প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ।
অস্থায়ী ভিত্তিতে উচ্চ আদালতে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এবং বিচারিক আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর, সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর, স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ দেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সুরক্ষা হচ্ছে না ।
দেখা যায়, সিভিলসহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোতে পরাজিত হচ্ছেন সরকার নিযুক্ত আইনজীবীরা । তবে এজন্য সরকার নিযুক্ত আইনজীবীদের অনিয়ম-দুর্নীতিকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, যখন যে দলীয় সরকার, তখন সে দলীয় আইনজীবীদের আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় এবং পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস পরিণত হয়েছে দলীয় পুনর্বাসন কেন্দ্রে। এতে করে সরকারি স্বার্থ কিছুটা রক্ষা হলেও রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একই সঙ্গে মামলা পরিচালনায় অসততা, প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের পক্ষে, কিন্তু গোপন সমঝোতায় আসামিপক্ষকে সহযোগিতার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। তবে প্রমাণের অভাবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এছাড়া নৈতিক দৃঢ়তা, পেশাদারিত্ব না থাকা এবং প্রশিক্ষণের অভাবও দেশের সরকারি আইনি সার্ভিসকে যেনতেন বিষয়ে পরিণত করেছে ।
বিশ্লেষকরা জানান, সাধারণ মানুষ আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন গ্রাউন্ডে যে দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন, সেসব মামলার বিবাদী সরকারপক্ষ। কিন্তু সরকারপক্ষ আইনজীবী হিসেবে মামলায় লড়ার যে দায়িত্ব দেয় তার ৯৫ ভাগ মামলায়ই চূড়ান্তভাবে সরকারপক্ষ পরাজিত হচ্ছে। অধিকাংশ মামলায় বাদীপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় তারা সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখলে রাখে। এসব অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করতে সরকার অভিযান চালালে প্রতিপক্ষ আদালতে মামলা ঠুকে দেয়। এ মামলা চলতে থাকে দীর্ঘসময় ধরে। এর মধ্যে অধিকাংশই ভূমিসংক্রান্ত মামলা ।
আবার এসব মামলায় সরকারপক্ষীয় আইনজীবীরা ইচ্ছাকৃত তথ্যপ্রমাণ আদালতে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারপক্ষ পরাজিত হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। তাদের হেরে যাওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো জবাবদিহিতাও থাকে না। এ বাস্তবতা থেকেই ২০১৯ সালের ৭ জুলাই ১০৫ জন আইনজীবীকে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ও ২১ জুলাই ৭০ জন আইনজীবীকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে সেটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকারী ফয়সাল রাষ্ট্রপক্ষের নীরবতার সুযোগে হাইকোর্ট থেকে অস্ত্র মামলায় জামিন পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের শুরুতে র্যাবের একটি দল আদাবরের বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির একটি ফ্ল্যাট থেকে ফয়সালকে দুটি বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করে। রাষ্ট্রপক্ষের নীরবতা, যথাযথ তথ্যের অভাব বা আইনি ত্রুটির কারণে উচ্চ আদালত তাকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জামিন দেয়।
স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস কত দূর
দীর্ঘদিনের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিযুক্ত হওয়ায় মামলা পরিচালনায় বেশিরভাগ সময়ই দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। আন্তরিকতার অভাব আর অবহেলায় মামলার সংখ্যা ও দীর্ঘসূত্রতা বাড়ছে। স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিসের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিয়োগ হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পাশাপাশি মামলা নিষ্পত্তিতে গতি আসবে।
এসব কারণে আইন কর্মকর্তাদের স্থায়ীভাবে নিয়োগের জন্য স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে দাবি উঠেছে। কিন্তু দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে কোনো সরকারই স্থায়ী নিয়োগের জন্য আইন করেনি ।
আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর সূত্র জানায়, বিগত ২০০২ সালে অ্যাটর্নি সার্ভিস আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট একই বছরের ১৫ মে অনুমোদন দেন। পরে ১৮ মে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
ওই অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে একই বছর ২ জুন সরকারি অ্যাটর্নি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়। জাতীয় প্রেস ক্লাবের দক্ষিণ পাশে সচিবালয় লিংক রোডের পরিবহনপুলের ১১ তলায় অফিসও নেওয়া হয়, কিন্তু পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে অধ্যাদেশটি সংসদে পাস না করে আবারও দলীয় বিবেচনায় আইনজীবী নিয়োগ অব্যাহত রাখে। যদিও জাতিসংঘ দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের বিধান রয়েছে ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিক অপেশাদার আইনজীবীদের আপত্তির কারণে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস আইনটি করা যাচ্ছে না। ওই সব সুবিধাভোগী আইনজীবী সরকারের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পদ-পদবি ব্যবহার করেন। ফলে অযোগ্য ও অদক্ষ আইনজীবীরা সরকারের আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন রাজনৈতিক বিবেচনায়। এতে সরকার, তথা রাষ্ট্র এবং প্রকারান্তরে সাধারণ ভোক্তভোগী মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ‘জাতীয় অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ’ নামে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইন করার জন্য প্রথমে একটি খসড়া তৈরিও করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কিছু বিষয় সংশোধনের পর দ্বিতীয় খসড়া তৈরি করা হয় । আইনটি প্রায় চূড়ান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত সময়ের অভাবে আর অধ্যাদেশ জারি করা হয়নি।
দুর্নীতিবাজদের ছাড় নেই : অ্যাটর্নি জেনারেল
সার্বিক বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আমার দেশকে বলেন, আমি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুভাবে পালনের চেষ্টা করছি। আমার টিমকেও সেভাবে দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে। আপনারা ইতোমধ্যে দেখেছেন, আমি কোনো অনিয়মকে প্রশ্রয় দিই না। যেকোনো যথাযথ অভিযোগ এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি।
তিনি বলেন, আমি যতদিন আছি কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না। সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা তা আমরা সবাই মিলে অপসারণ করব।
স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস বলেন, এটি সরকারের একটি নীতিগত বিষয়। সরকার যেটি ভালো মনে করবে, সেটিই করবে। তবে সবাই যদি যার যার কাজটি আন্তরিকতার সঙ্গে করে, তবেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্পেশাল কনসালটেন্ট ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ হওয়ার কারণে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে তাদের দল ও ব্যক্তিস্বার্থ বেশি রক্ষা করে নিজেরা লাভবান হন । এতে তাদের চাকরির স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা যায় না। কার্যত সারা দেশের এসব আইনজীবী ইচ্ছেমতো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। না তারা আইন মন্ত্রণালয়, না অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস, কারো কাছেই জবাবদিহি করে না। নামকা ওয়াস্তে জেলা প্রশাসকদের কাছে রিপোর্ট করার কথা থাকলেও তা তারা করে না।
তিনি আরো বলেন, তারা পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। অথচ দুই বছর, এক বছর পর কাউকে বাদ দেওয়া হয় অথবা কেউ নিজেই পদত্যাগ করেন। কিন্তু এর কোনো জবাবদিহি থাকে না। স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস হলে সবাই চাকরির আওতায় আসবেন। এখান থেকে তাদের পদোন্নতি হবে আর তাদের কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা যাবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে স্পিকারের শোক
ভারতে গোরক্ষকদের বিরুদ্ধে রায়, মুসলিম বিচারককে হত্যার হুমকি