গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভার পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা উদ্ধার নাটকে মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে এখনো জেলে বছরের পর বছর বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন বহু আলেম। এ মামলার প্রথম চার্জশিটে এসব আলেমের নাম ছিল না। বিতর্কিত এ মামলা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার পরও দলকানা বিচারকরা হাসিনাকে খুশি করতে আলেমদের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে নিজেরা পুরস্কৃত হন।
মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় থাকা আলেমরা হলেন—মুফতি শফিকুর রহমান, মাওলানা আমিরুল ইসলাম, মুফতি আবদুল হাই, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা আবু বকর, মাওলানা আব্দুর রউফ ও মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম। বিচার চলাকালে এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা ইয়াহিয়ার কারাগারে নির্যাতনে মৃত্যু হয়।
চাঞ্চল্যকর এ মামলায় প্রথম চার্জশিটে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছিল। সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সি আতিকুর রহমান সেটির চার্জশিট দিয়েছিলেন। সেখানে এসব আলেমের নাম ছিল না। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম তখনকার প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী আলেমদের এই মামলায় ঢুকিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই ২০১৭ সালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারপতি মমতাজ বেগম এ আলেমদের ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রায় দেয় । আর আওয়ামী লীগের শাসনামলের সময় ২০২১ সালে হাইকোর্টের বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও মোহাম্মদ বদরুজ্জামান নিম্ন আদালতের সে বিতর্কিত রায় বহাল রাখেন।
মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অন্য একটি মামলার আসামি মুফতি হান্নানের জোরপূর্বক নেওয়া জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে এসব আলেমের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। উচ্চ আদালত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে মুফতি হান্নানের জবানবন্দিগুলোকে ‘আইনের চোখে অবিশ্বাসযোগ্য’ ঘোষণা করে বাতিল করে। জবানবন্দিগুলো নিয়মবহির্ভূতভাবে এবং অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল বলে আদালত এ রায় দেয় । যদিও মুফতি হান্নানের সেই সাজানো জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে শফিকুর রহমান, আব্দুল হাই, শেখ ফরিদ, আবু তাহের, ইয়াহিয়া, আব্দুর রউফসহ অনেক আলেমকে ২১ আগস্টের মামলাতেও আসামি করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি উচ্চ আদালত এই মামলায় সবাইকে নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দেয়।
কোটালীপাড়ায় হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় এসব আলেমের বিরুদ্ধে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অথবা সমর্থনমূলক সাক্ষ্য প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে না পারলেও তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিল আদালত। যদিও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বা সমর্থনমূলক প্রমাণ ছাড়া শুধু একজনের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অন্য কাউকে সাজা দেওয়া যায় না। কিন্তু এ মামলায় আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে রায় দেয় তৎকালীন আওয়ামী বিচারকরা ।
মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বদরুজ্জামান লিখেনÑ‘যেহেতু ষড়যন্ত্র আকারে ইঙ্গিতে কিংবা নীরবতার মাধ্যমেও হতে পারে, তাই সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো একজনের জবানবন্দির ভিত্তিতেই বাকিদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া যাবে। এক্ষেত্রে বাড়তি সাক্ষ্যের কিংবা সমর্থনমূলক সাক্ষ্যে কিংবা অন্য কোনো প্রমাণের দরকার নেই।’
হাসিনার আজ্ঞাবহ বিচারকরা যে, এ রায় লিখেছেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় মামলার পেপারবুকে। রায়ের এক জায়গায় বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বদরুজ্জামান লিখেছেন-‘কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টা সফল হলে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ যারা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিভীষিকাময় ঘটনার মধ্য দিয়ে শহীদ হওয়ার কারণে এ সার্বভৌম দেশটি যতটুকু পিছিয়ে গিয়েছিল, ঠিক আবারও অনুরূপ একটি ঘটনার অবতারণা হতো। আদতে এ দেশটি দুর্ভাগা এ কারণে, জাতির পিতাকে সপরিবারে বিনা দোষে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল ঘাতকের দল। দুনিয়ার কোনো সভ্য দেশে এমনিভাবে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার ঘটনা বিরল। কাজেই এ মামলায় সংঘটিত ঘটনাকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার অবকাশ নেই।’
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে এলে ষড়যন্ত্রকারীরা বিভিন্নভাবে তাকে ২০ বার হত্যার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে উল্লিখিত নৃশংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হতে পারে।
পর্যবেক্ষণে বিচারক আরো বলেন, ‘মুফতি হান্নানের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী ২০০০ সালের জুলাই মাসে হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে বৈধ সরকারকে উৎখাতের জন্য শেখ হাসিনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। ওই বছরই কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলে ও হেলিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ও ৪০ কেজি ওজনের শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল। সমাবেশের আগে চায়ের দোকানে বদিউজ্জামানের মাধ্যমে পুলিশ তা উদ্ধার করে। বারবার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রথম ঘটনা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ২০০০ সালের ২০ জুলাই, দ্বিতীয় ঘটনা ২০০১ সালে খুলনায়, তৃতীয় ঘটনা ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটে, চতুর্থ ঘটনা ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায়। এ কারণে হুজি ও জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গি ও আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে উল্লিখিত নৃশংস ও ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হতে পারে।
বিচারকদের আওয়ামী সংশ্লিষ্টতা
সাজানো এ মামলায় প্রহসনের রায় দেওয়া বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসর হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক থাকাকালে হাসিনার নির্দেশে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামী এবং এটিএম আজহারুল ইসলামের ফাঁসির আদেশ দেন।
শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টা মামলা এবং যুদ্ধাপরাধ মামলায় প্রহসনের বিচারের পুরস্কারস্বরূপ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ পান। জুলাই বিপ্লবে হাসিনার পতনের পর বিচারপতি জাহাঙ্গীর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বিচারপতি বদরুজ্জামান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জান্নাতুল ফেরদৌসী রুপার স্বামী। দুর্নীতি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ৯ মার্চ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত রুপার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। হাসিনার পলায়নের পর বদরুজ্জামানকে বিচারিক কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
২০০০ সালের ২২ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার শেখ লুৎফুর রহমান সরকারি কলেজ মাঠে শেখ হাসিনার জনসভার প্যান্ডেল প্রস্তুতকালীন ২০ জুলাই ৭৬ কেজি ওজনের বোমা উদ্ধারের একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। তার তিনদিন পর ২৩ জুলাই শেখ হাসিনার হ্যালিকপ্টার নামার জন্য তৈরি হ্যালিপ্যাডের কাছ থেকে আরো ৪০ কেজি ওজনের বোমা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়েছিল।
একই রকম ঘটনা, কিন্তু মামলায় আসামি ভিন্ন ভিন্ন। ২০ জুলাই উদ্ধার হওয়া বোমা মামলায় যাদের আসামি করা হয়, ২৩ তারিখে উদ্ধার হওয়া বোমা মামলায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইন, রাষ্ট্রদ্রোহ ও হত্যা ষড়যন্ত্র আইনে আসামি করা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ১৪ জনকে। এ ১৪ জনের বিরুদ্ধেও মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় আসামি ভিন্ন ভিন্ন হয় কীভাবে সেটা রহস্যজনক। তর্কের স্বার্থে যদি যেকোনো এক মামলার আসামিদের দোষী ধরে নেওয়া হয়, তাহলে অন্য মামলার আসামিরা নিরপরাধ। কিন্তু ফ্যাসিস্ট হাসিনার ক্যাঙ্গারু কোর্ট এক মামলায় ১০ জন ও অন্য মামলায় ভিন্ন ১৪ জনের মৃত্যুদণ্ড দেয়। প্রশ্ন ওঠে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিয়ে। বাস্তবিকভাবে একই ঘটনার আসামি ভিন্ন হতে পারে না ।
উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায়
হাসিনা হত্যাচেষ্টার মামলার নিম্ন আদালতের রায়সহ সব নথি ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর তৎকালীন প্রধান বিচারপতির কাছে নথি উপস্থাপন করা হলে তিনি জরুরি ভিত্তিতে এ মামলার পেপারবুক তৈরির নির্দেশ দেন। প্রধান বিচারপতির নির্দেশে এরই মধ্যে পেপারবুক তৈরি হলে হাইকোর্টে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। কিন্তু হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ কয়েকবার পুনর্গঠন হওয়ায় মামলাটি শুনানিতে আসেনি। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মামলাটি শুনানির জন্য বারবার তোলার কথা বলা হলেও তা এখনো হয়নি। ফলে এ আলেমদের বছরের পর বছর জেল খাটতে হচ্ছে।
হাসিনা পরিবারের নিরাপত্তা আইন পাস করতে বোমা নাটক
এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা আমিরুল ইসলামের ছেলে মুজাহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ২০০০ সালে খুনি হাসিনা ও তার পরিবারের আজীবন নিরাপত্তা বিল পাস করার জন্য কোটালীপাড়ায় ৭৬ কেজি বোমা মামলার নাটক সাজানো হয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনা অনেক জঙ্গিনাটক সাজিয়ে পাইকারি হারে দেশের বড় বড় আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদকে আসামি করে জেলখানায় পাঠায়। তাদের বন্দির কারণ এসব আলেমরা ভারতের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। হাসিনার অন্যায়, জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলেন। এসব বোমার নাটক সাজিয়ে হাসিনা নিজ পরিবারের আজীবন নিরাপত্তা বিল পাস করে ও বিদেশি প্রভুদের খুশির ক্ষেত্রে সফল হয়।
তিনি বলেন, আমার বাবা ৭০ বছর বয়সি একজন প্রখ্যাত আলেম। লেখালেখি, তালিম, তাজকিয়া নিয়েই তিনি ব্যস্ত থাকতেন। তাকেসহ বহু আলেমকে হাসিনা হত্যাচেষ্টা মামলায় জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর আমরা ন্যায়বিচার পাব বলে বিশ্বাস করে আজও অপেক্ষায় আছি।
আরেক কারাবন্দি মুফতি শফিকুর রহমানের জামাতা গিয়াস উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, আমার শ্বশুর ছিলেন ইসলামী ঐক্যজোট গঠনের অন্যতম কারিগর। এতেই শেখ হাসিনার টার্গেটে পরিণত হন তিনি। ৭৬ কেজি বোমার ঘটনা সম্পূর্ণ একটি সাজানো নাটক। যে বোমার না বিস্ফোরণ হলো, না সেখানে কেউ হতাহত হলো। এ রকম একটা বানোয়াট ঘটনায় কাউকে ২০ বছর, কাউকে ২৫ বছর যাবৎ কারাগারে শিকলবন্দি করে রাখা হয়েছে। আইনি জটিলতায় মামলার শুনানি হচ্ছে না, আমরা রায়ও পাচ্ছি না।
উদ্দেশ্যমূলকভাবে আলেমদের এ মামলায় জড়ানো হয়Ñদাবি আইনজীবীদের
এ ব্যাপারে মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান এবং মাওলানা শেখ ফরিদের আইনজীবীরা জানান, মামলার এজাহার, চার্জশিট এবং রায়সহ প্রতিটি বিষয়ে আলেমরা নির্দোষ প্রমাণিত হন। অন্য মামলায় আদালত রায়ে বলেছে, সাজানো স্বীকারোক্তিতে এ মামলায় আলেমদের সাজা দেওয়া হয়। মামলার দীর্ঘসূত্রতার জেরে তাদের এখনো জেলে অন্তরীণ রাখা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন লাইট হাউসের সদস্য সচিব এবিএম সাইফুল্লাহ আমার দেশকে বলেন, স্বনামধন্য আলেমদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হাসিনার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। এভাবে বিভিন্ন এজেন্ডায় আলেমদের জঙ্গি হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে স্বৈরাচার হাসিনা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

