আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে ইকবাল চৌধুরী

গুম করে একটি কক্ষে রাখা হয় মনে হয় জীবন্ত কবরে ছিলাম

স্টাফ রিপোর্টার

গুম করে একটি কক্ষে রাখা হয় মনে হয় জীবন্ত কবরে ছিলাম
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) বা আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন গুমের শিকার ইকবাল চৌধুরী। জবানবন্দিতে তিনি জানান, তাকে গুম করে একটি কক্ষে রাখা হয়, তখন মনে হয়েছিল তাকে যেন জীবন্ত কবরে রাখা হয়েছে।

গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন

জবানবন্দিতে ইকবাল বলেন, আমি শিক্ষকতা ও ব্যবসা করতাম। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড, খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, গুম, খুন, হত্যা ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে যোগাযোগ লেখালেখি করি। এর জেরে ২০১৮ সালের ৭ মে রাত আনুমানিক ১১টার দিকে আমার মোহাম্মদপুরের বাসায় সাদা পোশাকধারী সাত-আটজন ব্যক্তি আসে। তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমার নাম ইকবাল চৌধুরী কি না। আমি স্বীকার করি। তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক বলে পরিচয় দেয়। কোন বাহিনী জিজ্ঞাসা করলে তারা আমাকে ধমক দিয়ে বলে, এত কথা বলা যাবে না।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, এরপর আমাকে নিচে এনে একটি মাইক্রোবাসে তোলে। সেখানে দুজন ডিবির লোক ছিল। গাড়িতে উঠানোর পর আমার চোখ বাঁধে, জমটুপি পরায় এবং হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেয়। গাড়ি ছেড়ে দিলে একজন আমাকে বলে, যা জিজ্ঞাসা করব সত্য বলতে হবে। না হলে ক্রসফায়ার দিয়ে আমার লাশ গুম করে ফেলবে। গাড়িটি ২০-৩০ মিনিট চলার পর থামলে গেট খোলার শব্দ শুনতে পাই। তখন গাড়িটি গেটের ভেতরে প্রবেশ করে। আনুমানিক দুই মিনিট পর গাড়ির দরজা খুলে দুইজন ব্যক্তি আমাকে হাত ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি জায়গায় নিয়ে বসায়। কিছুক্ষণ পর একজন লোক এসে আমার নাম জিজ্ঞাসা করে। আরেকজন আমার ব্লাড প্রেশার মাপে। সেখান থেকে এক-দেড় মিনিট হাঁটিয়ে নিয়ে আরেকটি জায়গায় দাঁড় করায়। তখন আমার চোখের বাঁধন, জমটুপি ও হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হয়। আমার পরনের কাপড় খুলতে বললে আমি খুলে দিই। এরপর আমাকে একটি পুরোনো লুঙ্গি ও পুরোনো টিশার্ট দেওয়া হয়।

জবানবন্দিতে ইকবাল আরো বলেন, আমাকে ৮-১০ ফুটবিশিষ্ট একটি রুমে রাখে। সেখানে ছোট একটি চৌকি ছিল এবং একটি তেল চিটচিটে বালিশ, পুরোনো ময়লা চাদর বিছানো ছিল। রুমের দেওয়ালে কোনো আস্তর ছিল না। দেয়ালগুলো ছিল এবড়ো-থেবড়ো। বিছানার সোজা ওপরে একটি লাইট ২৪ ঘণ্টা জ্বালিয়ে রাখত। সামনের দেয়ালে বড় একটি অ্যাকজাস্ট ফ্যান ছিল এবং এতে প্রচণ্ড শব্দ হতো। রুমের সামনে প্রথমে লোহার শিকের দরজা এবং এরপর কাঠের দরজা ছিলো। তারা অ্যাকজাস্ট ফ্যানটি চালিয়ে লোহার দরজা ও কাঠের দরজাটি বন্ধ করে চলে যায়। আমি ভয়ে কান্নাকাটি করতে থাকি এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করি। মনে হলো, আমি একটি জীবন্ত কবরে আছি। এ পর্যায়ে সাক্ষী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এরপর অসুস্থবোধ করায় জবানবন্দি রেকর্ড স্থগিত করা হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...