পাঁচ দফা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে দেখা করতে আসা সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা 'মব' তৈরি করেছে এমন কথা থেকেই গতকাল রোববার ঢাবি ও সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
রোববার বিকেলে অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের কার্যালয়ে সাক্ষাতে এলে সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের প্রতি 'অশোভন' করা হয়েছে এমন অভিযোগ এনে সড়ক অবরোধ ও পরে ড. মামুন আহমেদের বাসভবন ঘেরাও করতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে সংঘর্ষে জড়ায় সাত কলেজ শিক্ষার্থীরা।
মূলত ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ভর্তি পরীক্ষায় অযৌক্তিক কোটা পদ্ধতি বাতিল করা; শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতার বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি না করানো; শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত বিবেচনায় শিক্ষার্থী ভর্তি করানো; ভর্তি পরীক্ষায় নেগেটিভ মার্ক যুক্ত করা এবং সাত কলেজের ভর্তি ফিয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে, মন্ত্রণালয় গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে ঢাবি ব্যতিত নতুন একটি অ্যাকাউন্টে ভর্তি ফির টাকা জমা রাখা- উল্লিখিত পাঁচটি দাবি ছিলো সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই বলছেন, সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের এই দাবিগুলোকে যৌক্তিকভাবে সমাধান করা যেতো। কিন্তু তা না করে দুটো পক্ষকে মুখোমুখি অবস্থান দাঁড় করানো হয়েছে। অথচ অধিভুক্তির মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান এর আগে সাত কলেজের সাথে কাজ শুরু করেছেন কোনো ধরনের সংঘাত ছাড়াই।
উপ-উপাচার্য ড. মামুন আহমেদের কার্যালয়ে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সাথে 'অশোভন' আচরণের অভিযোগ এনে পরে এর প্রতিবাদে অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদকে ক্ষমা চাওয়া ও পদত্যাগের দাবিতে সন্ধ্যায় সায়েন্সল্যাব, টেকনিক্যাল ও তাঁতিবাজার সড়ক অবরোধ করে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা।
সড়ক অবরোধ শেষে ঢাবি উপ-উপাচার্যের (শিক্ষা) বাসভবন ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেয় সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে সংঘাত ও উত্তেজনা শেষে এটি সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে দুপক্ষের অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
এছাড়াও রাত সাড়ে তিনটায় ঢাকা কলেজে এক সংবাদ সম্মেলনে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা সোমবার ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে শাটডাউন কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
সংঘর্ষের নেপথ্যে স্বয়ং উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ড. মামুন আহমেদ রয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এবিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথা বলছেন অনেকেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দপ্তর সেলের সেল সম্পাদক জাহিদ আহসান বলেছেন, প্রো-ভিসি স্যার দুঃখ প্রকাশ বার্তা যেহেতু দিয়েছেন সেটা আরো আগে দিলে এই সংঘাতের ঘটনা ঘটতো না।
এবিষয়ে ঢাবির পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সালেহিন বলেন, প্রো ভিসি ড. মামুন আহমেদের সাথে দেখা করাকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এর দায় উপ-উপাচার্য মামুন স্যারের ৷ তিনি এর দায় এড়াতে পারেন না।
উপ-উপাচার্য ড. মামুন আহমেদ সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছেন উল্লেখ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের রিফাত হোসেন নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, উনি চাইলে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো মেনে নিতে পারতেন। তা না করে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে সাত কলেজকে ঢাবির বিপক্ষে এবং ঢাবিকে সাত কলেজের বিপক্ষে নিয়ে গেছেন।
এদিকে সাত কলেজের পাঁচ দফা দাবি যৌক্তিক ছিলো, সেগুলোকে সুন্দরভাবে সমাধান করা যেতো বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী ওমর বলেন, তাদের দাবিগুলোতো অযৌক্তিক না। এর আগেও তো তারা আন্দোলন করেছে কিন্তু এত বড় সংঘাত বাঁধেনি। মামুন স্যারে অপরিণামদর্শীতার কারণে এমনটি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়া শুরু করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রোববার রাত দশটা থেকে অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদকে দুঃখপ্রকাশ করে একটি ভিডিওবার্তা দিতে বললেও সেটি দিতে তিনি গড়িমসি করেন। পরে রাত একটার দিকে তিনি ভিডিও বার্তা দেন।
ভিডিও বার্তায় অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সাথে আমার অফিসে আলোচনাকে কেন্দ্র করে রাতে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছে তা দুঃখজনক। এতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। আমি বিশ্বাস করি সুষ্ঠু পরিবেশে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এই ভুল বুঝাবুঝির অবসান হবে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে যে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছে তা প্রশমনের জন্য সব পক্ষকে ধৈর্য ধারণের জন্য সব পক্ষকে আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছি।
রাতে উক্ত উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে শান্ত থাকার আহ্বান জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। তিনি বলেন, দেশ বর্তমানে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এসময় নিজেদের মধ্যে সংঘাত করে তৃতীয় পক্ষকে সুযোগ তৈরি করে দেওয়া যাবে না।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের শ্রেণিকার্যক্রম স্থগিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। রোববার রাত দুইটায় জনসংযোগ দপ্তর থেকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
সাত কলেজের অধিভুক্তি নিয়ে ঢাবি প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমদ বলেছেন, সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিল চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমরাও সাত কলেজকে ঢাবির সাথে রাখতে চাই না।
অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে আজ সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টায় এক জরুরি সভা ডেকেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। রোববার রাতে জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, সভায় অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
উল্লেখ্য, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময় সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলেও উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান তাদের সাথে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত রাখেন। কিন্তু এবারই প্রথম প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ খান সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার কথা বলার কিছু সময় পরেই এই সংঘাত শুরু হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

