গুণী শিক্ষক

গবেষণায় আজীবন সাধনা, বিশ্বমঞ্চে অরুণ বসাক

গবেষণায় আজীবন সাধনা, বিশ্বমঞ্চে অরুণ বসাক
অরুণ কুমার বসাক

বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা আর শিক্ষকতাকে জীবনের দীর্ঘ পথচলার সঙ্গী করেছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রেখে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এই প্রথিতযশা পদার্থবিজ্ঞানী।

গত ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ নেন তিনি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির (এপিএস) ২০২৬ সালের ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা, বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসার এবং দেশে কম্পিউটার প্রযুক্তির বিকাশে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক এ স্বীকৃতি বাংলাদেশের বিজ্ঞান গবেষণার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

৮৬ বছর বয়সেও গবেষণা ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা। তার কাছে এই স্বীকৃতি কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের বিজ্ঞানশিক্ষা ও গবেষণারও সম্মান। তরুণদের মৌলিক গবেষণায় আগ্রহী হয়ে ওঠা এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিবেশ সমৃদ্ধ করাই এখন তার প্রত্যাশা।

গত ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় এপিএস ২০২৬ সালের ফেলোদের তালিকা প্রকাশ করে। এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৫৩ জন পদার্থবিজ্ঞানী এ মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি লাভ করেছেন।

নিউক্লিয়াস-নিউক্লিয়াস বিভবের প্রয়োগে নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যার সমাধানে অবদানের জন্য অধ্যাপক বসাককে মূল্যায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশে কম্পিউটার সচেতনতা ও বিজ্ঞানশিক্ষা বিস্তারে তার ভূমিকাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

মেধার স্বীকৃতি স্কুল জীবনেই

পাবনার রাধানগর মজুমদার একাডেমি থেকে ১৯৫৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন অরুণ কুমার বসাক। এরপর ১৯৫৯ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন।

পরে রাজশাহী সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৬১ সালে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। মেধার এই ধারাবাহিকতা পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও অব্যাহত থাকে।

১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায়ও প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন তিনি। একই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণার প্রতি প্রবল আগ্রহ তাকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু ১৯৬৫ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজে বৃত্তি পেলেও পাকিস্তান সরকারের পাসপোর্ট জব্দের কারণে বিদেশযাত্রা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে নতুন পাসপোর্ট পেয়ে কমনওয়েলথ পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কলারশিপে ইংল্যান্ডে যান। পরে ১৯৭৫ সালে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

প্রতিকূল পরিস্থিতি তার পথ রুদ্ধ করতে পারেনি। অধ্যবসায়, মেধা ও গবেষণার প্রতি অঙ্গীকার তাকে আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

নিউক্লীয় গবেষণায় অবদান

নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞান অধ্যাপক বসাকের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র। নিউক্লিয়াস-নিউক্লিয়াস বিভবের প্রয়োগ নিয়ে তার গবেষণা নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন জটিল সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে তার ১৩৯টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তার গবেষণাপত্রগুলো ১ হাজার ৫৭১ বার উদ্ধৃত (সাইটেড) হয়েছে বলে জানা গেছে।

গবেষণার পাশাপাশি বিজ্ঞানশিক্ষা ও প্রযুক্তির প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার অবদান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিশিক্ষার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

তার উদ্যোগেই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রথম কম্পিউটার স্থাপিত হয় বলে জানা যায়। এ উদ্যোগ উত্তরাঞ্চলে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার বিকাশে নতুন দিগন্তের সূচনা করে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ শিক্ষকতা শেষে ২০০৮ সালে অবসর নেন অধ্যাপক বসাক। শিক্ষকতা ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে তাকে ইমেরিটাস অধ্যাপক করা হয়।

তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টির স্কুল অব ফিজিক্যাল সায়েন্সেসের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও তার কাজের স্বীকৃতি রয়েছে। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ইলিয়ন ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ প্রফেসর হিসেবেও কাজ করেছেন।

শিক্ষকতা ও গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গোল্ড মেডেল এবং ২০০৬ সালে বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস গোল্ড মেডেল পান। এ ছাড়া বিভিন্ন বৃত্তি ও ফেলোশিপ পেয়েছেন তিনি। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞান’ বইটিও তার রচনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

গুণী শিক্ষক সম্মাননা ও এপিএস ফেলো নির্বাচিত হওয়ায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে অরুণ কুমার বসাক বলেন, এই স্বীকৃতি আমার দীর্ঘদিনের গবেষণা, শিক্ষকতা ও বিজ্ঞানচর্চার প্রতি এক ধরনের সম্মান। আমি মনে করি, এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বাংলাদেশের বিজ্ঞানশিক্ষা ও গবেষণার জন্যও গর্বের বিষয়।

তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের তরুণ শিক্ষার্থীরা যেন বিজ্ঞানচর্চা ও মৌলিক গবেষণায় আরো বেশি আগ্রহী হয়, সেটিই আমার প্রত্যাশা। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রাখা সম্ভব।

রাবির জন্য গৌরব

অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ লাভ এবং এপিএস ২০২৬ সালের ফেলো নির্বাচিত হওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম।

উপাচার্য বলেন, এ অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। একজন শিক্ষক সমাজে কী অবদান রাখছেন, নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক সুনাম, গবেষণার মান ও সাইটেশনসহ ১০ থেকে ১২টি সূচক বিবেচনায় গুণী শিক্ষক নির্বাচন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, অধ্যাপক বসাক তার নিজস্ব যোগ্যতা, গবেষণা ও দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবেই এ সম্মাননা পেয়েছেন। এটি তার ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়েরও গৌরব।

ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমান প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। গুণী শিক্ষক সম্মাননার যোগ্য ও সম্ভাবনাময় শিক্ষকদের তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যোগ্য শিক্ষকদের জাতীয় স্বীকৃতির আওতায় আনতে কাজ চলছে। ভবিষ্যতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো অনেক শিক্ষক এ ধরনের সম্মাননা অর্জনের যোগ্যতা রাখেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এপিএস ফেলো সম্পর্কে তিনি বলেন, আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির মতো আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ সংগঠনের ফেলো নির্বাচিত হওয়া অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের দীর্ঘদিনের গবেষণা, শিক্ষকতা ও বিজ্ঞানচর্চার এক অসাধারণ স্বীকৃতি। তার এই অর্জনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো বাংলাদেশ গর্বিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...