জাতির মেরুদণ্ড শিক্ষা কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন শিক্ষকরা। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষক নিয়োজিত রয়েছেন। শিক্ষার মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির স্বার্থে তাদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা নিশ্চিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই অবস্থান থেকে এখনো বেশ দূরে রয়েছেন তারা।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা পর্যায়ক্রমে বাড়লেও বঞ্চনা আর বৈষম্য থেকে আজও পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেননি তারা। নানা সংকট নিয়েই কাটছে মানুষ গড়ার এই কারিগরদের জীবন। এখনো বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নামতে দেখা যায় তাদের অনেককে।
মূলত কম বেতন-ভাতা, বদলি, পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তোষ, চাকরির অনিশ্চয়তা, কাজের চাপ ও কর্মপরিবেশ নিয়ে শিক্ষকদের সংকট উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি অবসর সুবিধা পেতেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে ইবতেদায়িসহ মাদরাসা শিক্ষকদের বঞ্চনা বেশি। এসব সংকটের পেছনে কার্যকর পরিকল্পনা ও অপর্যাপ্ত বাজেটকে অন্যতম দায়ী করেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় মেধাবীদের অনেকে শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এদিকে বাড়তি সুবিধা বা প্রভাব বিস্তারের আশায় শিক্ষকদের একটি অংশ আবার অনিয়ম, দুর্নীতি, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে শুরু করে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর খবর পাওয়া যায়। এতে চাকরিচ্যুতিসহ নানা শাস্তির পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও সামাজিকভাবে স্বাভাবিক মান-মর্যাদা হারাচ্ছেন তারা। প্রায়ই দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের ওপর শিক্ষার্থী বা অন্যদের হামলা, মারধর, লাঞ্ছনা বা হুমকির ঘটনাও ঘটছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের আর্থিক ও চাকরির নিশ্চয়তাসহ যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সব শিক্ষাকে জাতীয়করণ, নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশে শিক্ষকদের এই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে আজ সোমবার পালিত হবে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সুপারিশ গ্রহণের ২৮ বছর পর ১৯৯৪ সালে দিনটিকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয় ইউনেসকো। এ বছর সেই সুপারিশের ৬০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। সেজন্য দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘শিক্ষকদের পাশে : পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর।’ বাংলাদেশে এবার দিবসটি গুরুত্বের সঙ্গে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, আজ দুপুরে ঢাকায় ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬’ জাতীয় পর্যায়ে উদযাপন করা হবে। অনুষ্ঠানে এবার গুণী শিক্ষক সম্মাননা দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন জানান, শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের ১০১ শ্রেষ্ঠ শিক্ষককে সম্মাননা ও পুরস্কার দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পর্যায়ে ১২ জন শিক্ষককে গুণী শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হতো। এ বছর প্রথমবারের মতো সংখ্যাটি বাড়িয়ে ১০১ জন করা হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগ শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের আরো বেশি উৎসাহিত করবে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষকদের পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়ের সাধারণ, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষকদেরও সম্মাননার জন্য বিবেচনা করা হবে। এছাড়া কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও থাকবেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৌশল ও বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত শাখা থেকেও শিক্ষক নির্বাচন করা হচ্ছে।
সূত্রমতে, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ‘সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক’ প্রসঙ্গে বলা হয়, গণিত, বিজ্ঞান, তৃতীয় ভাষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, আইটি ও কারিগরিসহ সব বিষয়ে মেধাবী তরুণদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করে গড়ে তুলে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং বিদ্যমান সব ক্যাডার ও নন-ক্যাডার শিক্ষকদের পর্যায়ক্রমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে। ইশতেহারের এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষকরা জানান, বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদরাসা শিক্ষকদের বঞ্চনা ও বৈষম্য বেশি। এর মধ্যে আবার নন-এমপিও শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও নানা দাবি-দাওয়া রয়েছে। বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে শিক্ষকরা আর্থিক বঞ্চনার পাশাপাশি গ্রেপ্তার-নির্যাতনসহ বিভিন্নভাবে চরম হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ নিয়ে চরম ক্ষোভ থাকলেও সে সময় তেমন কেউ মাঠে নামতে না পারেননি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বঞ্চিত শিক্ষকদের আন্দোলনের হিড়িক পড়ে যায়। তাদের অনেক দাবিই পূরণ করে ওই সরকার। কিছু দাবি পূরণের বিষয় এখনো ঝুলে আছে। সরকারের নতুন পে স্কেলে এমপিও শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির ঘোষণায় স্বস্তি বিরাজ করলেও বাকিরা অনিশ্চয়তায় আছেন।
সূত্রমতে, কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোয় লক্ষাধিক শিক্ষক চরম অবহেলিত। সেখানে চাকরির যেমন কোনো নিরাপত্তা নেই, তেমনি খুব কম বেতনে বাড়তি চাপ নিয়ে শিশুদের পড়ান তারা। একই অবস্থা ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোতেও। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্ধলাখ শিক্ষক চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
এ বিষয়ে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয় শিক্ষক ফোরামের সভাপতি শেখ নজরুল ইসলাম মাহবুব বলেন, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, বিভিন্ন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ ১৮০ জন এমপির ডিও লেটার জমা দেওয়া হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সরকারের দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি দেখতে পাচ্ছি না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আশায় আছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। এ দাবিতে তারা বহু আন্দোলনও করেছেন। সেই আন্দোলনে থাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, আমরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সরকারের কাছ থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের ঘোষণা চাই।
সমস্যা শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নয়, সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকদের অনেক বঞ্চনার কথা জানা গেছে। এ বিষয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করে এক শিক্ষক জানান, ১৬ বছর আগে দশম গ্রেডে যোগদান করে এখনো একই জায়গায় রয়েছি। পাওনা থাকলেও কোনো ধরনের গ্রেড পরিবর্তন হয়নি। সম্প্রতি তাদের বেশ কিছু দাবি সরকারকে জানানো হয়েছে, তবে এখনো কোনো সমাধান হয়নি।
দেশের শিক্ষকদের সংকট ও বর্তমান সরকারের উদ্যোগ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান সেলিম ভূঁইয়া বলেন, গত বছর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত শিক্ষক সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছিলেন যে, ক্ষমতায় গেলে শিক্ষকদের জাতীয়করণের চেয়েও বেশি কিছু দেবেন। তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমরা সেই ঘোষণার বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছি।
ইতোমধ্যে সরকার অনেক উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষক দিবসে গুণী শিক্ষকদের ২ লাখ টাকা করে সম্মাননা দেওয়া হবে, এটি ভালো পদক্ষেপ। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বিষয়টিও ইতিবাচকভাবে দেখছে সরকার। ৭০০ কোটি টাকা হলেই জাতীয়করণ সম্ভব হবে বলে একটি প্রস্তাব দিয়েছি। জাতীয়করণ হলে শিক্ষকদের অনেক সমস্যা, দুর্নীতি-অনিয়ম কেটে যাবে।
সূত্রমতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরাও বেশ হয়রানি ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে একজন সিনিয়র শিক্ষক জানান, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সেখানে শিক্ষকরা বেশ জুলুমের শিকার হন। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, অথচ তাদের চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা তুলনামূলক স্বস্তিতে থাকলেও তারাও দাবিমুক্ত নন। সম্প্রতি উপাচার্যদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সংলাপে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ নানা দাবি তুলে ধরা হয়।
এদিকে নানা বঞ্চনা সংকটের মাঝে কিছু শিক্ষকের দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরো শিক্ষকসমাজের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে বলে অনেকের অভিমত। এজন্য শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পেশাগত নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছ নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা।
আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক এবিএম ফজলুল করিম বলেন, সব শিক্ষাকে জাতীয়করণ করলে শিক্ষকদের সমস্যা ও সংকট দূর হয়ে যাবে। আর দুর্নীতি-অনৈতিকতা থেকে তাদের রক্ষা করতে অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এ বিষয়ে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, কিছু সংখ্যক শিক্ষক নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ড করে পুরো শিক্ষক সমাজকে কলুষিত করছেন। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের তাঁবেদারির মাধ্যমেও শিক্ষকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষকদের বিরত রাখতে হবে। শিক্ষকদের পুনরায় মর্যাদার আসনে বসানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


