যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে প্রকাশ্যে আজান প্রচারের বিরোধিতা করেছেন অঙ্গরাজ্যটির লেফটেন্যান্ট গভর্নর মিকাহ বেকউইথ। তার দাবি, গির্জার ঘণ্টাধ্বনি আমেরিকার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ হলেও ইসলামের আজান আমেরিকান সংস্কৃতি বা ইতিহাসের অংশ নয়।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যের অলাভজনক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ানা সিটিজেন এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নিজের ‘আস্ক মিকা এনিথিং’ ভিডিও সিরিজে এক দর্শকের প্রশ্নের জবাবে বেকউইথ বলেন, গির্জার ঘণ্টা বাজানো যদি অনুমোদিত হয়, তাহলে ইসলামের আজান কেন নীরব রাখতে হবে—এমন প্রশ্নের পর তিনি আজানের প্রকাশ্য সম্প্রচারের বিরোধিতা করেন।
বেকউইথ কোনো নির্দিষ্ট মসজিদ বা স্থানীয় বিরোধের কথা উল্লেখ করেননি এবং কোনো নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব করেননি। সাধারণত প্রকাশ্যে ধর্মীয় শব্দ সম্প্রচারের ক্ষেত্রে স্থানীয় আইন প্রযোজ্য হতে পারে। তবে আদালতের বিভিন্ন রায়ে বলা হয়েছে, এসব আইন ধর্মীয় বক্তব্যের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক হতে পারে না।
ইন্ডিয়ানা মুসলিম অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক মালিহা জাফর বলেন, তার জানা মতে ইন্ডিয়ানার কোনো মসজিদই লাউডস্পিকারে বাইরে আজান সম্প্রচার করে না।
জাফর আরো জানান যে যে, মুসলিম সম্প্রদায় বর্তমানে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষত জনসমক্ষে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের কারণে মুসলিমরা নিজেদের অনিরাপদ মনে করছে।
তিনি বলেন, মসজিদগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে এবং সক্রিয় বন্দুকধারী মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে প্ল্যাকার্ড নিয়ে এসে ভাঙচুর ও অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, তিনি প্রতিটি মসজিদের সঙ্গে তার যোগাযোগে নেই এবং তাই এ ধরনের ঘটনার ব্যাপকতার সঠিক হিসাব তিনি দিতে পারবেন না।
জুন মাসে স্টেটহাউসে অনুষ্ঠিত ‘ফেইথ ওভার ফিয়ার’ অনুষ্ঠানে জাফর বলেন, ইন্ডিয়ানা জুড়ে মুসলিম পরিবারগুলো ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষপূর্ণ জনমত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জাফর বলেন, ‘যখন কুসংস্কার এবং অপতথ্যকে বিনা প্রতিবাদে চলতে দেওয়া হয়, তখন তা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে মানুষ নিজেদের অবাঞ্ছিত, বিচ্ছিন্ন এবং ভীত বোধ করে।’
বেকউইথ সোমবার যুক্তি দিয়েছেন যে, ইসলামি আযান আমেরিকান সংস্কৃতির জন্য একটি বহিরাগত বিষয়। তিনি একজন দর্শকের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, যিনি জানতে চেয়েছিলেন যে গির্জার ঘণ্টা বাজানোর অনুমতি থাকলেও কেন ইসলামিক আজানকে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে।
বেকউইথ পরামর্শ দিয়েছেন যে, যারা ইসলামিক আজান শুনতে চান, তাদের এমন দেশে যাওয়া উচিত যেখানে এই প্রথাটি স্থানীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসের অংশ। তিনি আরও পরামর্শ দিয়েছেন যে, মসজিদগুলো প্রকাশ্যে আজান সম্প্রচার করার পরিবর্তে নামাজের সময় হলে সদস্যদের কাছে টেক্সট মেসেজ পাঠাতে পারে।
বেকউইথ বলেছেন, ‘ইসরাইল এবং ইন্ডিয়ানার বাকি অংশের সম্প্রদায়গুলোতে উচ্চস্বরে ইসলামিক আজান বাজানোর কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই’।
মে মাস থেকে তীব্রতর হওয়া ইসলামের বিরুদ্ধে তার ব্যাপক সমালোচনা অব্যাহত অংশ হিসেবেই বেকউইথ এই মন্তব্যগুলো করেন।
খ্রিস্টান রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ফ্ল্যাশপয়েন্টে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বেকউইথ ইসলামের সমালোচনা করেন এবং বলেন যে আমেরিকানদের ‘আবার ঘৃণা করার অনুমতি’ থাকা উচিত। একই মন্তব্যে তিনি ইসলামকে একটি ‘শয়তানের উপাসক গোষ্ঠী’ হিসেবেও বর্ণনা করেন। পরে তিনি দাবি করেন যে এই ধর্মটি ‘নাৎসিবাদের চেয়েও খারাপ’, । পরে তিনি আজান নিষিদ্ধ করার জন্য প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস
তবে বেকউইথের দাবি করা ‘ইসলাম আমেরিকান সংস্কৃতি বা ইতিহাসের অংশ নয়’ এর সঙ্গে দেশটির ইতিহাসের বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখা যায়।
ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব আফ্রিকান আমেরিকান হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার এবং লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয়দের বসতি স্থাপনের প্রাথমিক সময় থেকেই উত্তর আমেরিকায় মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল।
১৫০০-এর দশক থেকেই উত্তর আমেরিকায় ইসলামের উপস্থিতি রয়েছে এবং ক্রীতদাস হিসেবে আসা আফ্রিকান মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় চর্চা বজায় রেখেছিলেন
এমনকি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধেও মুসলমানরা উপনিবেশগুলোর পক্ষে লড়াই করেছিলেন। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ওয়াশিংটন ও থমাস জেফারসন ধর্মীয় স্বাধীনতার বিতর্কের সময় ইসলামকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিলেন।
থমাস জেফারসন লিখেছিলেন যে ভার্জিনিয়ার ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমানসহ সবার সুরক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছিল।
আমেরিকান সংস্কৃতিতে প্রাথমিক আফ্রিকান মুসলিমদের প্রভাব ব্লুজ সঙ্গীতের সুরের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়।
ফলে ইন্ডিয়ানায় প্রকাশ্যে আজান প্রচার নিয়ে বেকউইথের মন্তব্য নতুন করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
এমএমআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


