সভায় বক্তারা

গুমের তদন্ত পুলিশের হাতে থাকা যৌক্তিক নয়

গুমের তদন্ত পুলিশের হাতে থাকা যৌক্তিক নয়
অধিকারের আলোচনা সভা

গুম সংক্রান্ত আইনে অভিযোগকারী অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে শাস্তি হিসেবে তার পাঁচ বছরের জেল ও পুলিশের হাতে গুমের ঘটনার তদন্তের ক্ষমতা থাকা যৌক্তিক নয়। এই খসড়া আইন হলো একটি আবর্জনা আইন। এই আইন সংবিধান স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে।

শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরের বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে গুমের ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেছেন সংসদ সদস্য, আইনজিবী, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও গুম ফেরত ব্যক্তিরা।

বিজ্ঞাপন

নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য (বিএনপি) এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন গুম সংক্রান্ত খসড়া আইন হাতে নিয়ে বলেন, এখানে যিনি গুমের অভিযোগ করবেন, তিনি যদি সেটি প্রমাণ করতে না পারেন তবে তার পাঁচ বছরের জেল হবে। আমাদের ইলিয়াস আলী-কে এখনো পাওয়া যায়নি। যদি ইলিয়াস আলীর স্ত্রী কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে থাকেন, আর তা যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রশ্ন হলো -তা প্রমাণ করার সুযোগ আসলে কতটুকু আছে? পুলিশ তদন্ত করে তা প্রমাণ করতে পারে না, আর একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষেও তা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। এসময় আইনটির খসড়া উপরে তুলে তিনি বলেন, ফলে এই ধরনের ব্যবস্থা যৌক্তিক (রিজনেবল) বলে মনে হয় না।

এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের গুম হওয়ার বিষয়ে তার স্ত্রী জিডি করতেও ভয় পাচ্ছিলেন বলে তিনি জানান। সংসদ সদস্য খোকন বলেন, ভাবিও জানতেন না ভাইকে কারা গুম করেছে বা কিডন্যাপ করেছে। হাসবেন্ড কিডন্যাপ হয়ে গেছে কিন্তু আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওয়াইফ এবং ঢাবি থেকে ল’তে পাশ করা ভাবি একটা জিডি করতে সাহস করে নাই। এরপর পাঠানোর পরও বলা হলো নেওয়া যাবে না। এরকম একটা মানুষের যদি এঅবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কী হবে? তাই একজন মানুষতো জানেই না কে গুম করেছে তাহলে প্রশাসনের কাছে কিভাবে অভিযোগ দিবে সে প্রশ্ন তোলেন এমপি খোকন। তিনি বলেন, পুলিশের কাছে তদন্তের জন্য যাওয়ার সময় এই বিষয়টি নিয়ে আমার সংশয় থাকে -পুলিশ কি আদৌ এটি যথাযথভাবে যাচাই করতে পারবে?

তিনি আরো বলেন, যাঁরা এই আইনের খসড়া তৈরি করেছেন, তাঁরা হয়ত বিষয়টি খেয়াল করেননি। কিন্তু আমার মনে হয়, আমরা যদি দীর্ঘমেয়াদে এই আইনটি বলবৎ রাখতে চাই, তাহলে এটিকে পুনর্বিবেচনা করা দরকার, যাতে এটি সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। এটি আমি মনে করি জরুরি, কারণ বাংলাদেশের মতো দেশে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসে, আর গণতন্ত্রে ক্ষমতার পরিবর্তন হবেই। তাই আইনটি এমনভাবে তৈরি হওয়া উচিত, যা যেকোনো সরকারের আমলেই সমানভাবে প্রযোজ্য ও গ্রহণযোগ্য থাকে। আশা করি, যাঁরা বর্তমানে এই বিষয়ে দায়িত্বে আছেন, তাঁরা এ নিয়ে আলোচনা করবেন।

ঢাকা ১৪ আসনের সংসদ সদস্য (জামায়াত) ও গুম ফেরত মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, এই খসড়া আইন হলো একটি আবর্জনা আইন। এই আইন সংবিধান স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। একইসঙ্গে আইনি প্রতিকারের সুযোগকেও সীমিত করে।

নারায়নগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য ও গুম ফেরত আব্দুল্লাহ আল আমিন জুলাই বিপ্লবের পর নতুন বাংলাদেশেও গুমের শিকারদের স্মরণে আয়োজিত কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বর্তমান সংসদকে নির্যাতিতদের প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করে নতুন গুম অধ্যাদেশের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই গুমের প্রমাণ লোপাট করে, সেখানে ভিকটিমের ওপর প্রমাণের দায় চাপানো এবং প্রমাণ করতে না পারলে উল্টো পাঁচ বছরের সাজার বিধান অত্যন্ত অমানবিক। এছাড়া, গুমের জন্য অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তদন্তভার দেওয়াকে তিনি অর্থহীন আখ্যা দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনগণ শুধু শাসকের ব্যক্তিবদল চায়নি, বরং সামগ্রিক শাসন ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন চেয়েছে। নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান না জানালে তারা ভবিষ্যতে এর রিভেঞ্জ নিবে বলেও হুশিয়ারি জানান তিনি।

গুম ফেরত ব্রিগেডিয়ার হাসিনুর রহমান নিজের দুইবার গুম হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং সংস্কারের অভাব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, যারা অতীতে এসব অপরাধের সাথে জড়িত ছিল, তারা এখনও স্বপদে বহাল রয়েছে। তিনি গুমের ঘটনায় জড়িত সংস্থাকে অনতিবিলম্বে সংস্কারের দাবি জানান। এছাড়া, তিনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে নীরব থাকা, যথাযথ তদন্তে অবহেলা এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে আমলাতান্ত্রিক আধিপত্যের কড়া সমালোচনা করেন। জনগণের টাকায় বেতন নিয়ে তাঁদের প্রতি অবহেলা বন্ধ করার এবং অপরাধীদের বিচারের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর আহ্বান জানান তিনি।

আলোচনাসভা থেকে সরকারের কাছে তিন দাবি তুলে ধরে অধিকার। বলা হয়, এক. গুমের অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর তদন্তভার দিতে হবে এবং তা আইনে উল্লেখ করতে হবে। দুই. গুমের শিকার যেসব ব্যক্তি এখনও ফিরে আসেনি, তাঁদের স্ত্রী-সন্তানরা যাতে গুম হওয়া ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনাসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন সে ব্যবস্থা করতে হবে। এবং তিন. যে সমস্ত ব্যক্তি গুমের পর ফেরত এসেছেন, তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এমনকি কাউকে কাউকে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বা নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। এই সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন