আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দক্ষিণের বাতিঘর পবিপ্রবি: শিক্ষা, গবেষণা ও সম্ভাবনার কেন্দ্র

জুবাইয়া বিন্তে কবির

দক্ষিণের বাতিঘর পবিপ্রবি: শিক্ষা, গবেষণা ও সম্ভাবনার কেন্দ্র

দক্ষিণবঙ্গের সবুজ হৃদয়ে বিস্তৃত পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃতি আর জ্ঞানের সম্মিলনে গড়া এক জীবন্ত কবিতা, এক স্বপ্নরাজ্য। ‘দক্ষিণের অক্সফোর্ড’ নামে খ্যাত এই বিদ্যাপীঠ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি ছয় ঋতুর রঙে রাঙানো এক অনন্ত অনুভূতির নাম। গ্রীষ্মে কৃষ্ণচূড়ার অগ্নিশিখা জ্বেলে তোলে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, বর্ষায় কদমফুলের কোমল পাপড়ি ছড়িয়ে দেয় ভেজা মমতার পরশ আর শরতের নীলাভ আকাশের তলে কাশফুলের শুভ্র ঢেউ দুলে ওঠে স্বপ্নের স্রোতের মতো।

ঋতু পরিবর্তনে রূপ বদলায় প্রকৃতি অথচ এই ক্যাম্পাস থেকে যায় একই সঙ্গে চিরচেনা ও চিরনবীন এক জীবন্ত কাব্যগ্রন্থ, যেখানে প্রতিটি পথ, প্রতিটি ধূলিকণা যেন লিখে রাখে অমলিন প্রেমগাথা। এখানের প্রতিটি ভবন, প্রতিটি প্রান্তর যেন ফুল আর সবুজে মোড়া নীরব কবিতা। দেয়ালে লেগে থাকে স্মৃতি, স্বপ্ন আর সাহসিকতার অক্ষরছাপ।

বিজ্ঞাপন

বিকালের নির্জনে প্রিয়জনের সঙ্গে হেঁটে চলা, হাসি-আনন্দ ভাগাভাগি কিংবা কদম-কাশের মালায় সাজানো চুলÑসব মিলিয়ে এই ক্যাম্পাস গড়ে তোলে এক মায়াবী আবহ, যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি বোনা হয় জীবনের উজ্জ্বল গল্প।

প্রকৃতির বর্ণিল আবেশে যেমন হৃদয় ভরে ওঠে, তেমনি শিক্ষার দীপ্ত আলোয় গড়ে ওঠে নতুন প্রজন্মের চিন্তাশক্তি। দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় পবিপ্রবি আজ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তÑযেখানে ডিগ্রি শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা হয়ে ওঠে স্বপ্ন, দায়িত্ব ও ভবিষ্যতের অঙ্গীকার। বিকাল নামলে পুরো ক্যাম্পাস প্রাণের মিলনমেলায় রূপ নেয়; ছাত্রছাত্রীদের হাসি-খুশি, ছবি তোলা কিংবা ফুলের সাজে একে অন্যকে রাঙিয়ে দেওয়া সবকিছুতে মিশে থাকে এক অনাবিল আবেগ আর অদ্ভুত মুগ্ধতা। এ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যে নয়, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার অগ্রযাত্রাতেও দক্ষিণবঙ্গকে করছে আলোকিত। এখানকার প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঋতু যেন স্মৃতির পাতায় লিখে যায় এক অমূল্য কবিতা পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যার বুকে মিলেমিশে আছে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা আর শিক্ষার দীপ্ত আভা।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস : কৃষিশিক্ষার প্রসার এবং দক্ষিণাঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সাবেক সচিব ও মন্ত্রী এম কেরামত আলীর হাতে গড়া পটুয়াখালী কৃষি কলেজকে ২০০২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলহাজ আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং স্থানীয় বিশিষ্টজনদের নিরলস সহযোগিতায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অত্র কলেজকে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। তখনকার শিক্ষক ও কর্মচারীরা বিশ্ববিদ্যালয়টির চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত হন।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে উপাচার্যের দায়িত্বে রয়েছেন বাকৃবির খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টি আধুনিকতার দিক দিয়ে অগ্রযাত্রায় নিয়োজিত করেছেন। তার নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত করেছে নিরলস ত্যাগ, সদিচ্ছা ও উদার ভাবমূর্তি।

পবিপ্রবি
পবিপ্রবি

প্রাকৃতিক অবস্থান : পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসটি দুমকি উপজেলার কেন্দ্রস্থলে, জেলা শহর থেকে ১৫ কিমি ও বরিশাল শহর থেকে ২৮ কিমি দূরে অবস্থিত। ১০৭.০৩ একরের সবুজে ঘেরা এই ক্যাম্পাসে রয়েছে আধুনিক হল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কেন্দ্রীয় মসজিদ, লাইব্রেরি ও খেলার মাঠ। ‘নীলকমল’ ও ‘লালকমল’ লেক, দৃষ্টিনন্দন কাঠের সেতু, ‘বিজয়-২৪ সড়ক’-এর দুপাশে আঁকা আলপনা আর ফুলের সৌন্দর্য মিলে ক্যাম্পাসে এক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া বরিশালের বাবুগঞ্জের খানপুরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বরিশাল ক্যাম্পাসে ১২ দশমিক ৯৭ একরে পরিচালিত হচ্ছে অ্যানিমেল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদ।

বর্তমান অবস্থা : বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে আটটি অনুষদে ৪ হাজার ২৯৬ শিক্ষার্থী, ২৬৫ শিক্ষক, ২২০ কর্মকর্তা ও ৪৮৯ জন কর্মচারী কর্মরত। চালু রয়েছে ৯টি ডিগ্রি কোর্স, ১০টি আবাসিক হল ও ৫৫,০০০+ বইসমৃদ্ধ ডিজিটাল লাইব্রেরি।

আধুনিক প্রযুক্তি ও রিসোর্স ব্যবস্থাপনা : ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র (ইলেকট্রনিক চিপ) প্রবর্তিত হয়েছে। ক্যাম্পাসব্যাপী হাই‑স্পিড ওয়াই‑ফাই, বাস, মিনিবাস ও মাইক্রোবাস সংযুক্তি, চালু হতে যাচ্ছে অটোমেশন প্রক্রিয়া। যাতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ডিজিটাল রূপায়ণ হবে।

ইএসডিএম অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের উপপরিচালক সিভিল প্রকৌশলী মুহাইমিনুল আলম ফাইয়াজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এক প্রেরণার নাম। তার সততা, অভিভাবকসুলভ আন্তরিকতা ও শিক্ষার্থীবান্ধব মনোভাব তাকে সবার কাছে করে তুলেছে বিশেষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তার নিবেদিতপ্রাণ প্রচেষ্টা তাকে ক্যাম্পাসের অন্যতম প্রিয়মুখে পরিণত করেছে। তিনি বলেন : ‘পবিপ্রবি আমার কাছে শুধু কর্মস্থল নয়, এটি আমার আত্মার ঠিকানা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল পদ ছেড়ে এসেছি এক বিশ্বাসে শিক্ষাই জাতির প্রকৃত শক্তি।

বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. কাজী রফিকুল ইসলাম স্যারের নেতৃত্বে আমরা শুধু ভবন নয়, গড়ে তুলছি এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিরাপদ, আধুনিক ও উদ্ভাবনমুখর পরিবেশে নিজের স্বপ্নকে ডানা মেলে উড়তে শিখবে। আমাদের প্রতিটি প্রচেষ্টা নিবেদিত আগামী দিনের বাংলাদেশের স্বপ্নসাধকদের জন্য।’

তিনি আরো জানান, প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে পরিকল্পিত হচ্ছে ভূমি উন্নয়ন, নতুন একাডেমিক ভবন, দশতলা দুটি আধুনিক ছাত্রাবাস, সুফিয়া কামাল হলের সম্প্রসারণ, নতুন আবাসিক ভবন, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, কালচারাল ল্যাবরেটরি, মুক্তমঞ্চ, মিনি স্টেডিয়াম এবং অত্যাধুনিক ব্যায়ামাগার, যা পবিপ্রবিকে আরো আধুনিক ও প্রাণবন্ত রূপে গড়ে তুলবে। অবকাঠামোগত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। বরিশাল ক্যাম্পাসে ৫০০ কোটি ও মেরিন ফিশারিজ ইনস্টিটিউটে ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে। শিক্ষার্থীরা এখন একটি আন্তর্জাতিকমানের, গবেষণাভিত্তিক ও স্বচ্ছ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখছেন।

গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংযুক্তি : পবিপ্রবির রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (আরটিসি) তত্ত্বাবধানে এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে ৮০১টি গবেষণা প্রকল্প, যার পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন গবেষক প্রফেসর ড. মো. মামুন উর রশিদ।

গবেষণার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো : গবেষণায় ধানের ৯টি জাত উদ্ভাবনের উন্নয়ন, বায়োচার প্রযুক্তি, জলহস্তী ও বাঘের কঙ্কাল সংরক্ষণ, কোরাল মাছ চাষে সাফল্য অর্জিত হয়েছে । চলছে BangFish, EcoPrawn, Fish SAFE 2025-সহ আন্তর্জাতিক প্রকল্প। চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি ও ভারত-নেপাল থেকে শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কোর্সে।

দক্ষিণের বাতিঘরখ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করছেন শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক প্রফেসর ড. কাজী রফিকুল ইসলাম। ১৯৭৩ সালে বরিশালে জন্ম নেওয়া এই মেধাবী ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিভিএম ও এমএস সম্পন্ন করার পর জাপানের কাগওয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং দুটি পোস্ট-ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০২ সালে শিক্ষকতা জীবনে পদার্পণ করে ২০১৬ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন তিনি।

জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় তার অদম্য যাত্রা তাকে এনে দিয়েছে শতাধিক গবেষণা প্রকাশনা, ১৭৯টিরও বেশি উচ্চমানের আন্তর্জাতিক জার্নাল আর্টিকেল, ২৪৭৩-এর অধিক সাইটেশন, ২৬ এইচ-ইনডেক্স এবং ৬৩ আই১০-ইনডেক্সের গৌরবময় স্বীকৃতি। শিক্ষা ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন আচার্য স্বর্ণপদক, রাষ্ট্রপতি পদক, গ্লোবাল রিসার্চ ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ডসহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি হলো এক মহৎ স্বপ্নÑএকটি আদর্শ, মানবিক এবং আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষা শুধু পেশাগত নয়, হবে চরিত্র গঠনের মূল ভিত্তি।

তিনি বলেন, ‘দক্ষিণবঙ্গের অক্সফোর্ডখ্যাত পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ইটপাথরের সমষ্টি নয়; এটি এক নতুন সভ্যতা নির্মাণের আঁতুড়ঘর। আমার স্বপ্ন এমন এক শিক্ষাঙ্গন, যেখানে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়বে ভয়হীন, নিঃশঙ্ক এবং পবিত্র পরিবেশে। আমি চাই এখানে না থাকুক মাদক, র‍্যাগিং কিংবা ভয়ভীতি; বরং প্রতিটি কোণে জ্বলে উঠুক গবেষণার দীপ্তি, নৈতিকতার দৃঢ়তা এবং উদ্ভাবনের আলোকরশ্মি।’

তিনি বিশ্বাস করেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি শুধু পরিকাঠামোয় নয়, বরং তার শুদ্ধতা, শৃঙ্খলা ও নৈতিক ভিত্তিতে। তাই তিনি নিয়মিত আবাসিক হল, একাডেমিক ভবন ও প্রশাসনিক দপ্তরগুলো পরিদর্শন করে শিক্ষক এবং কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করছেন। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি বরাবরই কঠোর এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার লক্ষ্যÑএকটি সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা।

তার স্বপ্ন সীমাবদ্ধ নয় শুধু দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে। তিনি চান পবিপ্রবি হয়ে উঠুক বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, এমন এক জ্ঞান ও গবেষণার বাতিঘর, যা বিশ্ব দরবারে দেশের পরিচয়কে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে। ‘দক্ষিণের এই অক্সফোর্ডকে আমি এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দিতে চাই, যেখানে প্রতিটি স্বপ্ন পাবে ডানা মেলে ওড়ার স্বাধীনতা, প্রতিটি শিক্ষার্থী খুঁজে পাবেন নিজের সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের শক্তি। আমরা একসঙ্গে কাজ করছি গবেষণাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত এক বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার জন্য। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা একদিন পবিপ্রবিকে শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাতারে পৌঁছে দেবে।’

প্রো-ভিসির দায়িত্বে রয়েছেন বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ ও কৃষি অনুষদের সিনিয়র প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান। তিনি ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর এ পদে যোগ দেন। দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়ংবুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১৩ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ড সদস্য, Zoological ও Entomological Society of Bangladesh-এর সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে তিনি সাদা দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, ‘গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানভিত্তিক শক্তিতে রূপান্তর করতে চাই।’ এ লক্ষ্যেই প্রতিটি বিভাগ ও গবেষণাগার একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে রয়েছেন প্রফেসর মো. আবদুল লতিফ। তিনি বলেন, ‘পবিপ্রবি আজ দক্ষিণাঞ্চল ছাড়িয়ে সারা দেশে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর্থিক স্বচ্ছতা ও পরিকল্পিত বাজেট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক প্রতিটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

বিশ্ববিদ্যালয়টির স্বনামধন্য রেজিস্ট্রার, কৃষিবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো. ইকতিয়ার উদ্দিন বলেন, ‘প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা চাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা নিরবচ্ছিন্ন সেবা পান এবং পবিপ্রবি হয়ে উঠুক দক্ষিণাঞ্চলের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের সেতুবন্ধ।’

জনসংযোগ বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর মাহফুজুর রহমান ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইমাদুল হক প্রিন্স বলেন, ‘পবিপ্রবির প্রতিটি প্রাঙ্গণ অগ্রগতি আর স্বপ্নপূরণের গল্প বলে। আমাদের প্রচেষ্টা এই সাফল্যগুলো সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং এই বিদ্যাপীঠকে জাতির গর্বে পরিণত করা।’

শিক্ষার্থী মারসিফুল রিমন, সফিকুল ইসলাম আকাশ, তানজিম ও প্রিতম দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি অফিসে অসৎ ও অযোগ্য কর্মকর্তাদের জায়গায় সৎ, দক্ষ এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে হবে। প্রভোস্টদের হল বাজেটে স্বচ্ছতা আনতে হবে আর শিক্ষার্থীদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’

তাদের আরো দাবি, বিভাগভিত্তিক ডিগ্রি চালু করা হোক। এতে নতুন বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং আন্তর্জাতিক মানে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার দ্বার উন্মুক্ত হবে। তাদের বিশ্বাস, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাবে।

কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী জিনাতুন্নাহার জুইন, আফিফা জেবিন ঐশী, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের আন্নাফি আইদা সাভা, মিসকাতুম মমতাজ মাম্পি, ইএসডিএম অনুষদের শিক্ষার্থী আফিয়া জাহিন, এনএফএসের তাসলিমা আক্তার, সুকন্যা টিপু এবং কৃষি অনুষদের চতুর্থ সেমিস্টারের ছাত্রী রোকেয়া জামান তৃশার প্রত্যাশা আরো বিস্তৃত। তারা বলেন, ‘গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং তার কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যসেবা আরো উন্নত হোক, হলে বাড়ুক নিরাপত্তা, আর মেয়েদের জন্য আবাসন সুবিধা সম্প্রসারিত করা হোক।’ তাদের মতে, নিরাপদ পরিবেশ, উন্নত চিকিৎসা ও গবেষণার সুযোগ ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে না।

একসময় যারা ছিলেন এই প্রিয় ক্যাম্পাসের উদ্যমী ছাত্র, আজ তারা ফিরে এসেছেন শিক্ষক হয়ে গর্ব, কৃতজ্ঞতা ও প্রাপ্তির এক নিঃশব্দ বিজয়ে। মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী পরিচালক (ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা) তরুণ কৃষিবিজ্ঞানী ড. সগিরুল ইসলাম মজুমদার আবেগ ভরে বলেন, ‘এই ক্যাম্পাস আমার দ্বিতীয় জন্মভূমি। কাদামাটির গন্ধে কৃষির যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ সে পথেই অন্যদের পথ দেখাচ্ছি। জাপানে উচ্চশিক্ষা শেষে ফিরে এসেছি আত্মার ঠিকানায়।’

উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর ড. মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন জানান, ‘একদিন যে স্বপ্ন দেখতাম এই ক্যাম্পাসে শিক্ষক হওয়ার, আজ সেই স্বপ্নই বাস্তব হয়েছে।’

পরিশেষে, দক্ষিণবঙ্গের অক্সফোর্ডখ্যাত পাঁচ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর একাগ্রতা ও ত্যাগে আজ পবিপ্রবি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের স্বপ্নপূরণের প্রতীক। সবুজে ঘেরা শান্ত ক্যাম্পাসে কদমফুল, বকুল, কাশফুলের কোমলতা, দৃষ্টিনন্দন লালকমল ও নীলকমল লেকের নীরবতা এবং দীপ্তিমান গবেষণার পরিবেশ মিলেমিশে এ বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রÑজন্ম দিচ্ছে আগামী প্রজন্মের স্বপ্ন ও আশা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন