সংরক্ষিত এলাকায় অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণ

সংরক্ষিত এলাকায় অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণ
ছবি: আমার দেশ

বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্র জর্ডান রোড এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ করছে একটি ডেভেলপার কোম্পানি। ইতোমধ্যেই প্রথম তলার কাজ শেষ করে দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ চলছে। তবে কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমোদন বা প্ল্যান পাস ছাড়াই নির্মিত হচ্ছে ভবনটি। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বরিশাল সার্কিট হাউস সংলগ্ন জর্ডান রোডের সংরক্ষিত এলাকায় কীভাবে এমন অনুমোদনবিহীন বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়দের অনেকেই।

তবে বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) কতিপয় কর্মচারীর যোগসাজশে ‘গ্রিন সিটি’ নামের ওই কোম্পানি ভবনটি নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ ভবনের জন্য কোনো প্ল্যান পাস করা হয়নি বলে স্বীকার করেছে বিসিসি। বিষয়টি জানার পর এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে যে ভূমিতে বহুতল ভবনটির নির্মাণ চলছে, তার মূল মালিকদের সঙ্গেও কোম্পানি প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এক পর্যায়ে তাদের মালিকানাই অস্বীকার করেন কোম্পানির কর্মকর্তারা।

ভূমির মালিক সালমা জাহান আমার দেশকে জানান, তার স্বামী মোস্তফা রফিক আহম্মেদ খান ৯ তলা ভবনের প্ল্যান চেয়ে সিটি করপোরেশনে একটি আবেদন করেছিলেন। এর আগে তিনি গ্রিন সিটি ডেভেলপারের সঙ্গে বহুতল ভবনের চুক্তি করেন। কিন্তু কিছুদিন পরই তিনি বুঝতে পারেন তিনি একটি ট্র্যাপে পড়েছেন। এরপর টেনশনে তার স্বামী স্ট্রোক করেন এবং ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান।

সালমা জাহান আরো জানান, এরপর ওই জমির ওয়ারিশ সূত্রে মালিক হিসেবে তিনি এবং তার দুই ছেলে রেজোয়ান আহম্মেদ খান ও রাফি খান অপি গ্রিন সিটির এমডি মঞ্জুর ফরাজী এবং কর্মকর্তা ইউসুফ কাজীর সঙ্গে বণ্টন চুক্তি করেন। কিন্তু কোম্পানির কর্মকর্তারা তাদের অগোচরে চুক্তিনামায় মালিক হিসেবে তাদের সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করেছেন। বিষয়টি জানার পর ওই বছর ১৬ আগস্ট তিনি ট্রিপল নাইনে ফোন করে বিস্তারিত জানালে কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ দিতে গেলে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের তিরস্কার করে বের করে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘আমি ডেভেলপার কোম্পানির কাছে প্ল্যান দেখতে চেয়েছিলাম এবং তাদের সাইনবোর্ড লাগাতে বলেছিলাম। কিন্তু পরে জানতে পারি কোনো প্ল্যান ছাড়াই বহুতল ভবন করছে কোম্পানিটি। আমরা এভাবে কাগজপত্র বা প্ল্যান ছাড়া কাজ করতে দিতে চাই না।’

এদিকে প্ল্যান ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে- স্থানীয়দের এমন অভিযোগের পর বিষয়টি জানার জন্য সার্বিক খোঁজ নিতে গতকাল সোমবার দুপুরে সিটি করপোরেশনে যান এই প্রতিবেদক। এ সময় বিসিসির প্ল্যান শাখার স্থপতি সাইদুর রহমান লুসান আমার দেশকে বলেন, গ্রিন সিটি নামের কোনো ডেভেলপার কোম্পানি বহুতল ভবনের জন্য আবেদন করেনি। তবে নগরীর জর্ডান রোড এলাকার বাসিন্দা মোস্তফা রফিক আহম্মেদ খান নামের এক ব্যক্তি ৯ তলা ভবনের প্ল্যান চেয়ে আবেদন করেছিলেন। আবেদনকারীর মৃত্যু হওয়ার কারণে প্ল্যানটি অনুমোদন হয়নি। এছাড়া ওই এলাকাটি সার্কিট হাউস এলাকা লাগোয়া। বিসিসির নতুন আইন অনুযায়ী সেখানে সর্বোচ্চ দ্বিতল ভবন করার বিধান রয়েছে। কোনোভাবেই সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা যাবে না।

স্থপতি লুসান আরো বলেন, ‘এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পেরেছি তাদের স্বাক্ষর জাল করে একটি ভুয়া প্ল্যান দেখিয়ে ওই কোম্পানিটি কাজ করছে। এ বিষয়ে গ্রিন সিটি কর্তৃপক্ষকে নোটিস দেওয়াসহ দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, নগরীর হাতেম আলী কলেজ সংলগ্ন এলাকার কনফিডেন্স ডিজাইনারের পরিচালক রিমন সিটি করপোরেশনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে তাদের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া প্ল্যান তৈরি করে গ্রিন সিটিকে সরবরাহ করেন।

সূত্রটি জানায়, সিটি করপোরেশনের নতুন আইন অনুসারে সার্কিট হাউস সংলগ্ন এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ করা যাবে না। বিষয়টি জানার পর মোটা অঙ্কের বিনিময়ে চক্রটি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া প্ল্যান তৈরি করেছে। বিসিসির সহকারী প্ল্যানার লোকমান হোসেন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার রোড ইন্সপেক্টর সাজ্জাদ, সালাউদ্দীন, বাবু এবং ইমরানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসাজশে এবং সংশ্লিষ্ট রোড ইন্সপেক্টরদের ম্যানেজ করেই বহুতল ভবনের কাজ শুরু করা হয়।

এ বিষয়ে সহকারী প্ল্যানার লোকমান হোসেন তার সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করে আমার দেশকে বলেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই জড়িত নন। তবে কেন তিনি ওই এলাকায় গিয়েছিলেন এবং মালিক পক্ষের সঙ্গে মিটিং করেছেন- এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের রোড ইন্সপেক্টর সাজ্জাদ বলেন, সিনিয়র হিসেবে তিনি ওই এলাকায় যান; তবে ওই এলাকার দায়িত্বে রয়েছেন বাবু। বিষয়টি তিনিই ভালো জানেন।

এ বিষয়ে রোড ইন্সপেক্টর বাবু আমার দেশকে বলেন, আমি কিছুই জানি না। কাজ হচ্ছে, তাও জানি না। প্রায় এক বছর ধরে নির্মাণকাজ চলছে, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রোড ইন্সপেক্টর জানেন না- তা কী করে সম্ভব-এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই তিনি লাইন কেটে দেন।

এ বিষয়ে গ্রিন সিটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইউসুফ কাজীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে বিসিসির প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন আমার দেশকে বলেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় প্ল্যান ছাড়া কোনো কাজ হবে না। যদি কেউ এ ধরনের কাজ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া প্ল্যান তৈরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে যারা জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া যেহেতু আপনার মাধ্যমে বহুতল ভবন নির্মাণের বিষয়টি জানতে পারলাম, সেক্ষেত্রে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব। দু-একদিনের মধ্যেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন