গুগলের এআই সার্চের মুখে ওয়েবসাইটগুলোর ভবিষ্যৎ কী

গুগলের এআই সার্চের মুখে ওয়েবসাইটগুলোর ভবিষ্যৎ কী

ইন্টারনেটের সবচেয়ে পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতাগুলোর একটি ছিল খুব সরল। প্রকাশকেরা তাদের কনটেন্ট গুগলকে ক্রল ও ইনডেক্স করার সুযোগ দেবে, আর গুগল সেই কনটেন্টের পাঠক তাদের ওয়েবসাইটে পাঠাবে। বিজ্ঞাপন, সাবস্ক্রিপশন ও সরাসরি পাঠক-সম্পর্কের মাধ্যমে সেই ট্রাফিক টিকিয়ে রাখবে সংবাদমাধ্যম, তথ্যভান্ডার, ছোট ব্যবসা ও নানা ধরনের অনলাইন সেবা। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সার্চের বিস্তারে সেই পুরোনো ব্যবস্থা এখন বড় পরিবর্তনের মুখে। ডেইলি সাবাহতে প্রকাশিত সালিহ কায়ার একটি মতামতধর্মী নিবন্ধে এমনই আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।

গুগলের এআই ওভারভিউ এখন ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর ওয়েবসাইটে পাঠানোর আগেই সারাংশ আকারে হাজির করছে। ফলে কোনো তথ্য জানতে ব্যবহারকারীকে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে ঢুকতে হচ্ছে না। গুগলের নতুন এআই মোড আরো এক ধাপ এগিয়ে কথোপকথনধর্মী অনুসন্ধান, তথ্যের সমন্বয় এবং বিভিন্ন কাজ একই প্ল্যাটফর্মে করার সুযোগ তৈরি করছে। অর্থাৎ গুগল কেবল ওয়েবের পথপ্রদর্শক না থেকে নিজেই তথ্য পাওয়ার প্রধান গন্তব্যে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে।

বিজ্ঞাপন

এর প্রভাবের কিছু পরিসংখ্যান ইতোমধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। চার্টবিটের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ আগের বছরের তুলনায় বিভিন্ন সংবাদ ওয়েবসাইটে গুগল সার্চ থেকে আসা ট্রাফিক প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশকদের ক্ষেত্রে এই পতন ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ। একই নিবন্ধে স্পার্কটোরোর হিসাব তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে গুগলের প্রায় ৬৮ শতাংশ সার্চ এমন পর্যায়ে শেষ হচ্ছে যেখানে ব্যবহারকারী কোনো বাইরের ওয়েবসাইটে ক্লিক করছেন না। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৪৯ শতাংশ।

এ ধরনের সার্চকে বলা হয় ‘জিরো-ক্লিক সার্চ’। অর্থাৎ ব্যবহারকারী প্রশ্ন করেন, কিন্তু উত্তর পেয়ে যান সার্চ পেজেই। আলাদা ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। ইউসিএলএর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে গুগল সার্চের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এখন কোনো পাবলিক ওয়েবসাইটে ক্লিক ছাড়াই শেষ হচ্ছে। এর অর্থ হলো, ইন্টারনেটে তথ্যের প্রবাহ যত বাড়ছে, তথ্যের মূল উৎস ওয়েবসাইটে পাঠকের সরাসরি প্রবেশ তত কমতে পারে।

ক্লিক কমার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে যেসব প্রতিষ্ঠান সার্চ-নির্ভর ট্রাফিকের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ওপর। ডেইলি সাবাহর নিবন্ধে সিয়ার ইন্টার‌্যাক্টিভের গবেষণার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এআই ওভারভিউ ব্যাপকভাবে চালুর পর অর্গানিক ও পেইড—দুই ধরনের ক্লিক-থ্রু রেটই বড় মাত্রায় কমেছে। এমনকি এআই উত্তরে কোনো ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া থাকলেও সেই লিংকে ক্লিক করার হার খুব কমে গেছে।

এর ফলে ছোট ও মাঝারি সংবাদমাধ্যম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বড় সংবাদ ব্র্যান্ডগুলোর সরাসরি পাঠক, সাবস্ক্রাইবার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অনুসারী রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় ভাষার সংবাদমাধ্যম, বিশেষায়িত ওয়েবসাইট ও নতুন প্রকাশনাগুলোর বড় অংশই নতুন পাঠক পাওয়ার জন্য সার্চ ইঞ্জিনের ওপর নির্ভর করে। সার্চে দৃশ্যমানতা কমে গেলে তাদের বিজ্ঞাপন আয়, সাবস্ক্রিপশন এবং পাঠক তৈরির সুযোগও সংকুচিত হতে পারে। এর ফলে গণমাধ্যমের বহুত্ববাদও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে মূল দ্বন্দ্ব। গুগলের এআই মডেলগুলো উত্তর তৈরি করতে ওয়েবে প্রকাশিত বিপুল পরিমাণ তথ্যের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সেই উত্তর সরাসরি গুগলের প্ল্যাটফর্মে দেওয়া হলে মূল কনটেন্ট তৈরি করা প্রকাশক পাঠক হারান। অর্থাৎ যে ওয়েবসাইটগুলো তথ্য তৈরি করে, এআই সার্চ তাদের কনটেন্ট ব্যবহার করে আরও কার্যকর উত্তর তৈরি করতে পারে; অথচ সেই উত্তরই আবার ব্যবহারকারীকে মূল ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন থেকে মুক্ত করে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিকে অনেক প্রকাশক ‘ট্রাফিকের কাঠামোগত সংকট’ হিসেবে দেখছেন।

গুগল অবশ্য এই অভিযোগ পুরোপুরি মেনে নেয়নি। কোম্পানিটির দাবি, এআই ওভারভিউ ও এআই মোড ওয়েবসাইটের লিংককে আরও দৃশ্যমান করার চেষ্টা করছে। ২০২৬ সালে গুগল ইনলাইন লিংক, ওয়েবসাইট প্রিভিউ এবং ‘প্রেফার্ড সোর্সেস’ সুবিধা যুক্ত করেছে। ব্যবহারকারীরা পছন্দের সংবাদমাধ্যমকে প্রেফার্ড সোর্স হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবেন। গুগলের হিসাবে এআই ওভারভিউয়ের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী এখন ২৫০ কোটির বেশি এবং এআই মোডের মাসিক ব্যবহারকারী ১০০ কোটির বেশি।

তবে গুগলের এই পদক্ষেপই আরেকটি প্রশ্ন তৈরি করছে—যদি এআই সার্চে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা এমনভাবে বদলে যায় যে অধিকাংশ তথ্য গুগলের মধ্যেই পাওয়া যায়, তাহলে ওয়েবের মূল প্রকাশকের অর্থনৈতিক মডেল টিকবে কীভাবে? শুধু লিংক দেখানো এবং বাস্তবে পাঠক পাঠানোর মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। একটি ওয়েবসাইটের জন্য হাজারো ইমপ্রেশনের চেয়ে প্রকৃত পাঠক, পেজভিউ, বিজ্ঞাপনদর্শন ও সাবস্ক্রিপশন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে বিষয়টি এখন কেবল প্রযুক্তি কোম্পানি ও সংবাদমাধ্যমের বিরোধ নয়; এটি প্রতিযোগিতা নীতি ও ডিজিটাল অর্থনীতির প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন গুগলের এআই সার্চে প্রকাশকদের কনটেন্ট ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। ইউরোপের নিয়ন্ত্রকেরা প্রকাশকদের কাছ থেকে জানতে চাইছে, গুগলের নতুন এআই সার্চ ব্যবস্থায় নিজেদের কনটেন্ট ব্যবহারের অনুমতি বন্ধ করার সুযোগ তাদের জন্য যথেষ্ট কি না।

গুগল ৩১ আগস্ট থেকে বিশ্বজুড়ে প্রকাশকদের জন্য এমন একটি নিয়ন্ত্রণও চালু করেছে, যার মাধ্যমে তারা চাইলে এআই ওভারভিউ ও এআই মোডে নিজেদের কনটেন্ট ব্যবহার বন্ধ করতে পারবেন। তবে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—এআই সার্চ থেকে সরে গেলে সেই সাইট এআই ফিচার থেকে ট্রাফিক বা ইমপ্রেশনও পাবে না। সাধারণ গুগল সার্চের র‌্যাংকিংয়ে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে না বলে গুগল জানিয়েছে।

এই পরিবর্তন গুগলের ব্যবসায়িক মডেলের বৃহত্তর রূপান্তরের অংশ। গুগল ধীরে ধীরে এমন একটি ‘এজেন্ট ম্যানেজার’ ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে, যেখানে সার্চ ইঞ্জিন শুধু ব্যবহারকারীকে তথ্যের উৎসের কাছে পাঠাবে না; বরং নিজেই তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, উত্তর তৈরি এবং বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করবে। এতে ব্যবহারকারী গুগলের ভেতরেই বেশি সময় থাকবেন এবং বাইরের ওয়েবসাইটে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে।

এই পরিবর্তনকে তাই শুধু ‘গুগল বনাম প্রকাশক’ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি। আগামী দিনে যদি ওয়েবসাইটগুলো তথ্য তৈরি করতে থাকে কিন্তু সেই তথ্যের অর্থনৈতিক সুবিধা প্রধানত এআই প্ল্যাটফর্মগুলো পায়, তাহলে নতুন ও স্বাধীন কনটেন্ট তৈরির প্রণোদনা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, স্থানীয় সংবাদ, বিশেষায়িত গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভিত্তিক কনটেন্টের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

তবে এআই সার্চের বিপরীতে একমাত্র পথ নিষেধাজ্ঞা নয়। প্রকাশক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে কনটেন্ট ব্যবহারের ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা, কপিরাইট, লাইসেন্সিং এবং ট্রাফিক ভাগাভাগির নতুন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমকেও শুধু সার্চ-নির্ভরতার ওপর না থেকে সরাসরি পাঠক, সাবস্ক্রিপশন, সদস্যপদ, নিউজলেটার ও নিজস্ব ডিজিটাল কমিউনিটি গড়ে তুলতে হবে।

কারণ গুগলের এআই সার্চের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি সম্ভবত প্রযুক্তিগত নয়—এটি ইন্টারনেটের ক্ষমতার কাঠামো বদলে দিচ্ছে। একসময় সার্চ ইঞ্জিন ছিল ওয়েবের দরজা; এখন সেই দরজার ভেতরেই যদি পুরো উত্তর পাওয়া যায়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়—দরজার ওপারে থাকা ওয়েবসাইটগুলোর ভবিষ্যৎ কী?

এ কারণেই গুগলের এআই ওভারভিউকে শুধু দ্রুত তথ্য পাওয়ার সুবিধা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। এটি একই সঙ্গে তথ্যের প্রবাহ, সাংবাদিকতার অর্থনীতি, কনটেন্ট সৃষ্টির প্রণোদনা এবং ওপেন ওয়েবের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। এআই যদি ওয়েবকে আরো সমৃদ্ধ করে, তাহলে তা হবে প্রযুক্তির সাফল্য; কিন্তু যদি ওয়েবের কনটেন্টকে ব্যবহার করেই ওয়েবসাইটগুলোর পাঠক ও আয় কেড়ে নেয়, তাহলে যে উন্মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবস্থা এআইকে বড় করেছে, সেটিই একদিন তার সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: ডেইলি সাবাহ ও রয়টার্স

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন