জ্বালানি সংকট উত্তরণে অসম চুক্তি বাতিল এবং নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিয়ে তারা বলেন, কারিগরি সমাধানের পাশাপাশি একটি বলিষ্ঠ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরা সম্ভব নয়। নিজস্ব সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও স্বচ্ছ জবাবদিহির মাধ্যমেই বাংলাদেশ একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।
রোববার বিকেলে ঢাকার একটি হোটেলে নীতিনির্ধারণী এক গোলটেবিল বৈঠকে এমন মতামত দেওয়া হয়।
‘ন্যাভিগেটিং দ্য এনার্জি ট্রানজিশন: ফরেন পলিসি অ্যালাইনমেন্ট অ্যান্ড জিওপলিটিক্যাল রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ইনস্টিটিউট অব পলিসি, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফর ডেভেলপমেন্ট বা আইপিজিএডি। আলোচনায় বারবার উঠে আসে জ্বালানি খাতের বর্তমান দুরাবস্থা, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অসম চুক্তির ফাঁদ, ভূরাজনৈতিক প্রভাব এবং এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের আইনি ও নীতিগত দিকনির্দেশনা।
সরবরাহের স্বল্পমেয়াদি সমস্যা, দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত ও উৎপাদন সংকটের কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যের সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুশতাক খান।
কাঠামোগত ভয়ংকর ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আওয়ামী সরকারের আমলে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে-কলমে বেড়েছে চার গুণ। কিন্তু বাস্তবে আমাদের খরচ বেড়েছে ১১ গুণ এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে ২০ গুণ। এটি কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রভাড়া লুট করার লোভেই এমন অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যেখানে জ্বালানি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থাই নেই।
২৫ বছর মেয়াদি সভরেন বা সার্বভৌম চুক্তির আইনি জটিলতা নিয়ে সতর্ক থাকা এবং আদানির চুক্তির উদাহরণ টেনে অধ্যাপক মুশতাক খান জানান, আমরা যদি বকেয়া বিল নিয়ে সাধারণ আন্তর্জাতিক আর্বিট্রেশনে বা সালিশিতে যাই, তবে নিশ্চিতভাবেই হেরে যাব। কারণ চুক্তির দলিলে তাদের পাওনা আইনগতভাবে বৈধ। আমাদের বরং আন্তর্জাতিক আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে, চুক্তিটি করার সময়ই ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছিল। আইনি ভাষায় যাকে বলে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’—অর্থাৎ চুক্তিটি গোড়া থেকেই বাতিলযোগ্য বা অবৈধ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) রিসার্চ ফেলো লাম-ইয়া মোস্তাক বলেন, জ্বালানি এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক পণ্য নয়, এটি একটি কৌশলগত সম্পদ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাসী এটি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। চীনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, চীন কেবল কার্বন নির্গমন কমাতেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে না; বরং আমদানিনির্ভরতা কমানোও তাদের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশকেও সেদিকে হাঁটতে হবে। তবে শুধু সোলার প্যানেল আমদানি করলেই হবে না, নিজেদের দেশে উৎপাদন সক্ষমতা বা ম্যানুফ্যাকচারিং বেইজ বাড়াতে হবে। তা না হলে এক সংকটের বদলে আমরা আরেক সংকটের ফাঁদে পড়ব।
এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে বিগত সরকারগুলোর চরম অবহেলার কড়া সমালোচনা করে বলেন, কুইক রেন্টাল ও এলএনজি আমদানির নামে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য আবাসিক খাতে ইনভার্টার এসি ও বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করতে হবে।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় ও উদ্যোক্তা অনুষদের সহযোগী ডিন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, পলিসি মেকাররা যদি আইন ও অর্থনীতির সমন্বয় না বোঝেন, তবে বিপদ অনিবার্য। বাংলাদেশের অর্থনীতি অসাধু ব্যবসায়ী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা মারাত্মকভাবে শোষিত হয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশনের চরম ব্যর্থতার কারণে সর্বত্র সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
অসম চুক্তিগুলোর কারণে বাজেটে যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তার পরিসংখ্যানগত চিত্র তুলে ধরে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানা। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গনি বলেন, জ্বালানি অবকাঠামোগুলো যদি বিদেশি শক্তির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
সংসদ সদস্য মানসুরা আলম জ্বালানি খাতের নীতিগত পরিবর্তন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাত্রার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতের রূপান্তর কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি সরাসরি দেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। ভাবতে হবে কীভাবে টেকসই, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে শক্তির উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য-সচিব ফরিদুল হক জ্বালানি সংকটকে সরাসরি জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আসলে বিদেশি অলিগার্ক বা লুটেরাদের হাতে জিম্মি করা হয়েছে। আদানির মতো কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক চুক্তি ছিল না। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে সেই বাড়তি টাকা দিয়ে একটি বিশেষ দেশের সমর্থন কেনা হয়েছে। এটি কেবল দুর্নীতি নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি সুস্পষ্ট হুমকি।
আইপিজিএডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা হোসেনের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফেরদৌস বাপ্পী।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


