বন্ধু নেই? বন্ধুত্ব গড়া ও টিকিয়ে রাখার উপায় জানাচ্ছে বিজ্ঞান

বন্ধু নেই? বন্ধুত্ব গড়া ও টিকিয়ে রাখার উপায় জানাচ্ছে বিজ্ঞান
ছবি: সিএনএন

বড় হওয়ার পর নতুন বন্ধু তৈরি করা সহজ নয়। পুরোনো বন্ধুত্বও অনেক সময় ব্যস্ততা আর দূরত্বের কারণে ফিকে হয়ে যায়। অথচ সুস্থ থাকতে এবং ভালো থাকতে বন্ধুত্বের গুরুত্ব অনেক। গবেষকেরা বলছেন, বন্ধু তৈরি করা ও বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার কিছু সহজ উপায় আছে। নিয়মিত চর্চা করলে এসব দক্ষতা আয়ত্ত করা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

২০০৮ সালের একদিনের ঘটনা। তখন জেইমি ক্রেমসের বয়স বিশের কোঠার শুরুতে। নিজের কম্পিউটারে গুগল চ্যাটের কিছু বার্তা দেখতে পান তিনি। কম্পিউটারটি ধার নিয়েছিলেন তার বাসার এক সঙ্গী। বার্তাগুলো পড়ে ক্রেমস বুঝতে পারেন, তার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু ও ওই বাসাসঙ্গী তাকে নিয়েই কথা বলছিলেন। কথাগুলো ছিল তার জন্য ভীষণ কষ্টের।

ক্রেমসের ভাষায়, তিনি একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই তার মনে প্রশ্ন জাগে, দুই বন্ধু কেন তৃতীয় একজনের সঙ্গে এমন আচরণ করেন? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের বন্ধুত্ব নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। পরে এ বিষয় নিয়েই নিজের কর্মজীবন গড়ে তোলেন।

ক্রেমসের মতে, বন্ধুত্ব নিয়ে গবেষণায় যথেষ্ট মনোযোগ ও অর্থায়ন নেই। প্রেমের সম্পর্ক কিংবা মানুষের মধ্যে বৈষম্য ও গৎবাঁধা ধারণা তৈরির বিষয়গুলো বরং বেশি গুরুত্ব পায়।

বৈষম্য নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও তিনি বলেন, বন্ধুত্ব আরো বেশি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।

গবেষক জুলিয়ান হোল্ট-লুনস্ট্যাডের একটি বিশ্লেষণের কথা উল্লেখ করে ক্রেমস বলেন, সামাজিক যোগাযোগের অভাব স্বাস্থ্যের ওপর এমন প্রভাব ফেলতে পারে, যা দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার ক্ষতির সমান।

বন্ধুত্ব গড়তে না পারার সমস্যা যে বাড়ছে, তার ইঙ্গিতও মিলছে বিভিন্ন তথ্যে। ক্রেমস গুগলের অনুসন্ধান প্রবণতার কথা উল্লেখ করে বলেন, গত বসন্তে ‘কীভাবে বন্ধু তৈরি করতে হয়’—এই বিষয়ে অনুসন্ধান সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ডেট করার সঙ্গী খোঁজা কিংবা প্রেমে পড়ার উপায় জানার চেয়ে এ বিষয়ে মানুষের অনুসন্ধান অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একাকিত্ব অনুভব করেন। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে ২০২৩ সালে একাকিত্ব নিয়ে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল।

তবে এ পরিস্থিতি বদলানোর উপায় রয়েছে বলে মনে করেন গবেষকেরা। ক্রেমস এখন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) সেন্টার ফর ফ্রেন্ডশিপ রিসার্চের পরিচালক। তার মতে, বন্ধুত্বকে জাদুর মতো মনে হলেও এর জন্য কিছু দক্ষতা প্রয়োজন। এসব দক্ষতা শেখা যায়। মানুষকে সেগুলো শেখানো সম্ভব হলে একাকিত্বের সমস্যা মোকাবিলা করা সহজ হবে। কারণ, এটি শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাও। আর এর প্রভাবে মানুষ অসুখী হয়ে পড়ে।

বন্ধুত্ব গড়তে যা প্রয়োজন

বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার দুটি প্রধান উপাদান রয়েছে বলে মনে করেন ক্রেমস। একটি হলো নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ, অন্যটি দুজনের মধ্যে পারস্পরিক পছন্দ বা আকর্ষণ।

অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক ড্যানিয়েল হ্রুশকার গবেষণাসহ বিভিন্ন গবেষণায়ও এ বিষয় উঠে এসেছে।

একই জায়গায় একই মানুষের সঙ্গে বারবার দেখা হওয়া বন্ধুত্বের শুরু হতে পারে। এমনকি প্রতি সপ্তাহে একই সময়ে কোনো কফিশপে বসে ডায়েরি লেখার মতো সাধারণ অভ্যাস থেকেও পরিচয় ও বন্ধুত্ব তৈরি হতে পারে।

ক্রেমস বলেন, নিয়মিত দেখা-সাক্ষাতের বিষয়টি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা তুলনামূলক সহজ। বারবার মানুষের সঙ্গে দেখা হলে এমন কারো সঙ্গে পরিচয় হতে পারে, যার সঙ্গে আপনার পছন্দ ও আগ্রহ মিলে যায়। বন্ধুত্ব গড়তে নিয়মিত যোগাযোগ এবং দুজনের মধ্যে পারস্পরিক পছন্দ—দুটিই প্রয়োজন।

নতুন বন্ধু তৈরির সুযোগ বাড়াতে ডার্টমাউথের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেনিস ম্যাককেবের পরামর্শ, এমন জায়গা খুঁজে নিতে হবে, যেখানে মানুষ বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী। তিনি এসব জায়গাকে বলেন ‘ফ্রেন্ডশিপ মার্কেট’ বা বন্ধুত্ব গড়ার উপযোগী পরিসর।

ম্যাককেব মানুষের নিজের পরিচয় ও আগ্রহের বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে এমন জায়গা খোঁজার পরামর্শ দেন। তার গবেষণার বিষয়, মানুষ কীভাবে এবং কেন একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।

তিনি বলেন, কেউ যদি নিজের পরিচয়ের নতুন কোনো দিক আবিষ্কার বা চর্চা করতে চান, তাহলে এমন জায়গায় যাওয়া উচিত, যেখানে মানুষ নিয়মিত একত্র হন এবং পরস্পরকে জানার সুযোগ পান। যেমন দৌড়ানোর ক্লাব। সেখানে দৌড়ানোর পাশাপাশি অন্যদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকে। একইভাবে তাৎক্ষণিক অভিনয় বা ইম্প্রোভাইজেশনের ক্লাস কিংবা শিল্পকলার ক্লাসেও নতুন বন্ধুত্ব হতে পারে।

বিদেশে বসবাসকারী মানুষের গোষ্ঠীকেও বন্ধুত্ব গড়ার উপযোগী জায়গা হিসেবে উল্লেখ করেন ম্যাককেব। অন্য দেশে গিয়ে অনেকে সেখানকার স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চান। তবে একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া অন্য বিদেশিদের সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। তাদের দেশ আলাদা হলেও বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা তাদের কাছাকাছি আনতে পারে।

ম্যাককেবের মতে, জীবনে নতুন কোনো পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে, তা নিজের ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, বিষয়টি খেয়াল করা জরুরি। এরপর একই অভিজ্ঞতা বা পরিচয়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো যেতে পারে। তারাও হয়তো নতুন সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী থাকবেন।

সাহায্য চাইলে বন্ধুত্ব বাড়ে

পরিচিত মানুষকে বন্ধু করে তোলার একটি উপায় হতে পারে তার কাছে ছোটখাটো সাহায্য চাওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, কারো কাছে উপকার চাইলে এবং তিনি তা করলে সম্পর্ক আরো গভীর হতে পারে।

ক্রেমস বলেন, বর্তমানে মানুষ আগের তুলনায় কম সাহায্য চায়। কারণ, একসময় বন্ধুরা যেসব কাজ করতেন, এখন স্মার্টফোনের বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে সেগুলো করা যায়। বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়া, অসুস্থ হলে বাজার করে দেওয়া, শিশুর দেখাশোনা, টেলিভিশন বসানো কিংবা ভারী সোফা সরানোর মতো কাজেও মানুষ এখন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেন।

কিন্তু কারো কাছে সাহায্য চাইলে এবং তিনি তা করলে, সাহায্যকারী ব্যক্তির কাছে সাহায্যপ্রার্থী আরো পছন্দের হয়ে উঠতে পারেন বলে জানান ক্রেমস।

অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে গেলে অনেকেই নিজেকে বোঝা মনে করেন। ক্রেমসও বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে অন্য ব্যক্তির জায়গায় নিজেকে কল্পনা করা যেতে পারে। কোনো বন্ধুকে সাহায্য করতে পারলে নিজেরও খুব ভালো লাগে। এমনকি সারা দিন আনন্দের অনুভূতি থাকে। অন্য কাউকে সেই আনন্দ দেওয়ার সুযোগও তৈরি হয় সাহায্য চাওয়ার মাধ্যমে।

কথা বলার সময় নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি বা দুর্বলতার কিছুটা প্রকাশ করাও সম্পর্কের বিশ্বাস বাড়াতে পারে। এমনটাই বলেন ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক অ্যালিসন নাগেল। তিনি কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের একাকিত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে কাজ করা ‘কানেকশন প্রজেক্ট’-এর পরিচালক।

নাগেল বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, একজন নিজের ব্যক্তিগত কথা খুলে বললে অন্যজনও নিজের কথা বলতে উৎসাহিত হন। যাঁরা নিজেদের সম্পর্কে কিছুটা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেন, তাদের অন্যরা বেশি পছন্দ করেন এবং বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন।

কতটা ব্যক্তিগত কথা বলা উচিত, তা বোঝার জন্য নাগেলের একটি সহজ পরামর্শ আছে। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, বাসে অপরিচিত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কি একই কথা শেয়ার করতেন?

যদি উত্তর না হয়, তাহলে বুঝতে হবে কথাটি কিছুটা ব্যক্তিগত। তবে নিজের কথা প্রকাশের ক্ষেত্রেও সীমারেখা থাকা জরুরি। নাগেলের মতে, নিজের মতো করে খোলামেলা হওয়া সম্ভব। কিন্তু কোনো সম্পর্ক যে মুহূর্তে যতটুকু গ্রহণ করতে পারে, তার চেয়ে বেশি প্রত্যাশা করা উচিত নয়। ধীরে ধীরে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই নিরাপদ।

বন্ধুকে ফোন করতে নিখুঁত সময়ের অপেক্ষা নয়

বন্ধুত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি তা টিকিয়ে রাখাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার জন্য একেবারে উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা না করার পরামর্শ দিয়েছেন ক্রেমস।

তার মতে, বন্ধুর সঙ্গে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য দুই ঘণ্টা সময় বের করতে হবে, এমন ভাবনার দরকার নেই। বরং ফোন করে কথা বলা উচিত।

গত আগস্টে ইউসিএলএতে দেওয়া এক টেডএক্স বক্তৃতায় ক্রেমস বলেন, বন্ধুর সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলার পাঁচ মিনিটও অনেক মূল্যবান। যে দীর্ঘ ফোনালাপের কথা ভেবে বারবার পিছিয়ে দেওয়া হয়, তার চেয়ে এই পাঁচ মিনিটের আন্তরিক যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সুযোগ পেলেই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন গবেষকেরা। নাগেল একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ছোটবেলায় খালার তৈরি করা বিশেষ কোনো খাবার রান্না করতে চাইলে তার কাছ থেকে রেসিপি চাওয়া যেতে পারে। এতে রেসিপি জানার পাশাপাশি কিছুক্ষণ কথাও বলা হবে। অন্যদিকে, গুগলে রেসিপি খুঁজে নিলে সেই যোগাযোগের সুযোগটি আর তৈরি হবে না।

নাগেলের মতে, গুগলে অনুসন্ধান করে নেওয়ার মতো ছোট ছোট পরিবর্তন মানুষের সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোকে আরো দৃঢ় করার সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে।

বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগের সুফলও অনেক। ক্রেমস বলেন, সামাজিক সম্পর্ক মানুষের মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা বাড়ায়। রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মানুষের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।

বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়ে করা কিছু গবেষণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগ তাদের ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি এক-তৃতীয়াংশ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি অর্ধেক কমাতে পারে।

বন্ধুত্বের গুরুত্ব বোঝাতে ক্রেমস বলেন, বন্ধুত্ব যদি কোনো ওষুধ হতো, তাহলে ইতিহাসে এটিই হতো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ওষুধ।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন