আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বসন্ত এসে গেছে

তনিমা রহমান

বসন্ত এসে গেছে

শীতের জরাগ্রস্ত আবেশ কাটিয়ে এসেছে ঋতুরাজ বসন্ত। স্নিগ্ধ সবুজ নতুন কচি পাতায় ঋদ্ধ হয়ে উঠেছে রিক্ত বৃক্ষরাজি। প্রকৃতি বসন্তের সাজে সেজেছে। বসন্তের আগমনে গাছে গাছে নতুন কচি পাতা, ফুলে ফুলে সজ্জিত প্রকৃতি। পলাশ-শিমুলের প্রস্ফুটিত হাসিতে বনে লেগেছে আগুনরঙের মেলা। বাতাসে মিশে আছে আম্রমুকুলের সুঘ্রাণ! বাঙালির জীবন রাঙাতে কোকিলের কুহুতানে মাতাল করতে এসেছে বসন্তরানি সবুজ-শ্যামল বাংলায়। তাই তো বসন্তের অপরূপ রূপে সাজে মন রাঙিয়ে কেউ কেউ আপন মনে গুনগুন করে গেয়ে ওঠে—

‘আমার মনেরই অঙ্গনে

বিজ্ঞাপন

সুখের ফাগুন এলো বুঝি।’

পলাশ-শিমুলের ডালে ডালে রক্তিম উচ্ছলতা। বনে বনে কিংবা মেঠোপথের ধারে নাম না জানা ফুলের সুবাস। কোকিলের গানে, ফুলের সুবাসে মুখর মৃদুমন্দ বাতাস কানে কানে পৌঁছে দেয় বসন্তের আগমনী ধ্বনি। আর তাই বসন্তের আগমনে সবাই কষ্ট-যন্ত্রণা, শোক-তাপ, গ্লানি-অপ্রাপ্তি আর হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নিই।

ফাগুনের আগুনহাওয়া গায়ে লেগে রঞ্জিত হৃদয়ে এক আশ্চর্য অনুভব শিহরন তোলে বসন্তের গুঞ্জরণে। তাই তো কবির ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে—

‘পলাশ ফুটেছে, শিমুল ফুটেছে

এসেছে দারুণ মাস।’

আগুনরাঙা এ ফাল্গুনে অশোক, শিমুল ও কৃষ্ণচূড়া শুধু প্রকৃতিতেই উচ্ছ্বাসের রঙ ছড়ায় না, আমাদের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের শহীদ ভাইদের স্মৃতিও যেন নতুন করে রাঙিয়ে তোলে। বায়ান্নর ৮ ফাল্গুনের একুশের পলাশরাঙা দিনের সঙ্গে তারুণ্যের সাহসী উচ্ছ্বাস আর বাঁধভাঙা আবেগের জোয়ার ও দেশপ্রেম যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

ফাল্গুনের বড় পরিচয় ভাষাশহীদদের ত্যাগের রক্তস্নাত মাস। ৮ ফাল্গুন মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য রফিক, জব্বার ও সালাম বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করছিলেন।

ফাল্গুন বারবার সুসজ্জিত হয়ে সদর্পে ফিরে আসে ঋতুরাজ বসন্তকে নিয়ে; দুঃশাসন ও স্বৈরাচারিতার মোকাবিলার দুর্বিনীত সাহস ও অপরিমেয় শক্তিতে বাংলার বীর সন্তানদের অমর ত্যাগের ইতিহাস নিয়ে। যেকোনোভাবে পর্যবেক্ষণে এটি এক অনন্য মাস, ঋতুরাজ বসন্তকাল। নৈসর্গিক ক্যানভাসে রক্তাক্ত বর্ণমালা যেন এঁকে দেয় অনির্বচনীয় সুন্দর এক আলপনা। সাদা অক্ষর আর আলপনার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে পিচঢালা সড়কের উদার বুকে। দেয়ালের গা থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত আঁকা হয় বর্ণ আর আলপনা।

তাই ফাগুন এলেই আগুন জ্বলে মনে, তাই ফাগুন এলেই ফুল ফোটে বনে, মন ভরে যায় কোকিলের কুহুতানে, ফাগুন এলেই রঙের জোয়ার বয়ে যায় মনে; কে যেন দোলা দিয়ে যায় আনমনে ক্ষণে ক্ষণে। ফাগুন এলেই আমের মুকুলের নির্ভেজাল মিষ্টি ঘ্রাণে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথে। বিচিত্র সব মুকুলের সুমিষ্ট সুবাসে আন্দোলিত হয়ে ওঠে মানুষের মন। বনফুল থেকে মৌমাছি-মধুমক্ষিকার দল গুনগুন রবে মধু আহরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আদিগন্ত ফাল্গুনের রূপের ব্যঞ্জনাময় উৎসবের আমেজ দারুণভাবে চারপাশের মানুষকে মোহিত করে। এজন্যই বসন্তের মাথায় স্মরণাতীত কাল ধরে ঋতুরাজ তথা শ্রেষ্ঠ ঋতুর মুকুট। কিন্তু নাগরিক জীবনে সেসবের সন্ধান বা দেখা সহজে না মিললেও থেমে থাকেনি নগরবাসীর বসন্তবরণ উৎসব। নানা রঙে নানা সাজে নেচে-গেয়ে নানা আয়োজনে তারা বরণ করে নেয় ঋতুরাজ বসন্তকে।

বসন্তের ফুলে ভরা ফাগুন খুঁজতে হলে এখন আর বাগান বা পার্ক ছাড়া রাজধানীবাসীর উপায় নেই। তারপরও বসন্তের প্রথম সকালে বাসন্তী রঙা শাড়ি, কপালে টিপ, হাতে চুড়ি, পায়ে নূপুর, খোঁপায় গাঁদা ফুল জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে তরুণী-বধূরা। বাসন্তী পাঞ্জাবি-ফতুয়া পরা হাজারো ছেলে-বুড়োর ঢল নামে বসন্তবরণের নানা আয়োজনে। নগরবাসী বসন্ত উৎসবের মাঝে খুঁজে ফেরে নিজস্ব সংস্কৃতি ও বাঙালিয়ানাকে। বনে রঙ থাকুক আর নাই থাকুক, মনে রয়েছে রঙের ফোয়ারা। বনফুলের রঙে সাজুক আর নাই রাঙুক, মনের রঙ তো আছে, মনের রঙের তো কোনো কমতি নেই। তাই কবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে সবার হৃদয়ে ধ্বনিত হয়—‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত।’

আর তাই তো মনমাতানো গানে সুরের ঝংকার, নূপুরের নিক্বণে যেন কোকিলের সুমিষ্ট কুহুতান শুনতে না পারার ক্ষোভ বা অভাব পূরণের জন্যই এত আয়োজন। ঢোলের তালে তালে শোভাযাত্রার মাঝে খুঁজে ফেরে নগরবাসী চিরচেনা আনন্দ।

কৃত্রিম ইট-পাথরের দেয়ালে আবদ্ধ, নিষ্প্রাণ কংক্রিটের রাজধানীতে যেটুকু সবুজ অবশিষ্ট আছে, সেখানে গেলেও নববধূরূপে মুকুলিত পত্র-পল্লবের সুশোভিত সবুজ উদ্যান দেখে চোখ জুড়াবে, মন ভরবে প্রকৃতির সরস মাধুর্যে তৃপ্তির স্বাদে। বসন্তের আবাহনে ফাগুনের ঝিরিঝিরি হাওয়া, রক্তিম পলাশ, শিমুল, কাঞ্চন, পারিজাত, মাধবী, গামারী আর মৃদু গাঁদার ছোট ছোট ফুলের বর্ণিল রূপে চোখ জুড়াবে। বোটানিক্যাল গার্ডেন, রমনা পার্ক, বলদা গার্ডেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক, বনানী লেক, মিন্টো রোড, হেয়ার রোড ও চারুকলার পেছনের সবুজ প্রাঙ্গণ ফুলে ফুলে বর্ণিল আর উচ্ছল-উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ফাল্গুন এলে বাসন্তী হাওয়ায়। প্রকৃতির এমন সরস ঐশ্বর্যে ভরপুর এই এলাকাগুলো যখন কোকিলের মধুর সুরে মুখরিত হয়, তখন তারুণ্যের মন-ময়ূরী উদাসী হয়ে অজানায় পাখা মেলে। মৃদুমন্দ বাতাসে ভেসে আসা ফুলের সৌরভে হৃদয়ে আলোড়ন তোলে বসন্ত, জানিয়ে দেয়—সত্যিই সে ঋতুরাজ।

বসন্ত ঋতুকে আরো বর্ণিল করে তোলে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো। বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি বা উৎসবের বেশিরভাগই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এই সময়ে। প্রকৃতি যেমন সজীবতায় নানা ফুলের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে, তেমনি চারপাশ নানা উৎসবে মুখর থাকে। বাঙালি সবসময়ই ভোজনরসিক। বিভিন্ন উৎসবে তারা আরো ভোজের আয়োজনে মেতে ওঠে।

বাঙালি উৎসবপ্রিয়। বাঙালি ফ্যাশনসচেতনও বটে। তাই তো বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংগতি রেখে পোশাক-পরিচ্ছদ নির্বাচন করে থাকে। তেমনি এক বর্ণিল সাজ-পোশাকের উৎসব হচ্ছে পহেলা ফাল্গুন। এ উৎসবের বড় একটি আকর্ষণ হচ্ছে পোশাক। বসন্তের সঙ্গে সংগতি রেখে বাসন্তী রঙকে প্রাধান্য দেওয়া হয় পোশাকে। এ উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসগুলোর ব্যস্ততা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। মানুষের রুচি ও চাহিদানুযায়ী নানা ধরনের নানা বর্ণের পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসে তারা।

পহেলা ফাল্গুনের উৎসব শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ নয়; মেয়েদের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে মাটির গহনা, মাটি ও পাথরের গহনা, হাতে নানা বর্ণের কাচের চুড়ি ইত্যাদি পণ্যের বাজারও জমজমাট হয়ে ওঠে। দিনে দিনে মানুষ ফ্যাশনসচেতন হয়ে উঠছে। এতে অলিগলিতে ফ্যাশন হাউসগুলোর সংখ্যা বেড়েই চলছে। বসন্তের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে না পারলে যেন পুরো উৎসবই মাটি। তাই তো এত আয়োজন নিজেকে সবার চেয়ে আলাদাভাবে উপস্থাপন করার।

ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে তাই প্রথম প্রহর থেকেই নগরবাসীর শুরু হয় অধীর প্রতীক্ষা; নাচে-গানে ও বর্ণিল সাজে বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি। প্রকৃতির উন্মাদনার পাশাপাশি বসন্তকে ঘিরে তরুণ-তরুণী, কবি, লেখক, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের সুরের ঝংকার, কবিতায়-গানে-সুরে নানা বৈচিত্র্যে অকারণ চঞ্চলতা, উতলা মুগ্ধতা। পুরোনোকে ঝেড়ে ফেলে আবারও নতুন সাজে, নতুন বেশে সজ্জিত হয় চঞ্চল প্রকৃতি ও মানুষ।

মন তখন চঞ্চল হরিণীর মতো ছুটে বেড়াতে চায়। প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ উতলা মন। বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের গানের ভাষায়—

‘বসন্ত বাতাসে গো, বসন্ত বাতাসে

বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ

আমার বাড়ি আসে...।’

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও অন্য কবি-সাহিত্যিকরা প্রকৃতির পালাবদলে যুগ যুগ ধরে রচনা করে আসছেন অজস্র গান ও কবিতা। কবিদের চোখে প্রকৃতি আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও বৈচিত্র্যময় রূপ-রস নিয়ে ধরা দেয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের বাউল কবিদের হৃদয়ও বারবার ছন্দের দোলায় দুলিয়েছে আর রঙের ভেলায় ভাসিয়েছে ঋতুরাজ বসন্ত। সেজন্য বসন্ত বাতাসে বন্ধুর বাড়ির ফুলের সুবাসে মন-প্রাণ মুগ্ধতায় চঞ্চল হয়ে ওঠে, বাউল কবির মনও আনচান করে।

বসন্ত মানেই সুন্দরের জাগরণ, নতুনের জয়গান আর নবীনের আগমন। চিরায়ত সুন্দরতম ভালোবাসা আর নবযৌবনের প্রতীক হয়ে বসন্ত আমাদের জীবনে হাসি-আনন্দ-উচ্ছ্বাস হয়ে উপস্থিত হয়। তাই তো দক্ষিণা বাতাসে জেগেছে নতুন শিহরন। কচি সবুজ পাতা আর লাল-হলদে বাসন্তী ফুল বসন্তের রঙে রাঙিয়ে দেয় প্রকৃতি, মানুষের মন। কবিতার ভাষায়—

‘হলদে, বাসন্তী, লাল আর কমলা/শাড়ি নিয়ে মাতোয়ারা, তরুণী-চপলা।

হাত ভরে চুড়ি বাজে—রুনঝুন, রিনিঝিনি/মাটির গয়না-গাটি; জম্পেশ বিকিকিনি।

এক পায়ে মল আর গোল টিপ কপালে/সাজুগুজু শুরু হয় সেই ভোর-সকালে।

পাঞ্জাবি, ফতুয়া—দুটোই যে চলছে/ছেলেগুলো হিমু হবে—সকলেই বলছে।’

বাঙালিকে হাতে হাত রেখে নিজস্ব স্বকীয়তায় উদ্ভাসিত হয়ে দেশি সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার করতে হবে। আর বসন্ত উৎসবকে ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে, প্রতিটি মানুষের অন্তরে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন