চীন: স্বপ্ন, শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার এক অনন্য ঠিকানা

মুমতাহিনা পারভীন

চীন: স্বপ্ন, শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার এক অনন্য ঠিকানা
শিয়ামেন বিশ্ববিদ্যালয়।

চীন হচ্ছে মানুষের স্বপ্ন পূরণের জায়গা, এখানে পড়াশোনার জন্য রয়েছে নিরাপদ, নিরিবিলি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। তাই তো অনার্স শেষে আবার ছুটে এলাম মাস্টার্স করতে। অবশ্য ফুল স্কলারশিপ পাওয়াটা ছিল অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার। আমার নাম মুমতাহিনা পারভীন। বর্তমানে চায়নার শিয়ামেন ইউনিভার্সিটি-এর ইকোনোমেট্রিক্স বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছি।

চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের শিয়ামেন শহরটি দ্বীপের আদলে গড়ে ওঠা একটি আধুনিক নগরী। চীনের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের ফুজিয়ান প্রদেশে অবস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের একপাশে সমুদ্রসৈকত, অন্যপাশে সারিবদ্ধ পাহাড়মালা। এর সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করে শেষ করা যায় না। রাস্তার দুই ধারে সারি সারি খেজুর গাছ শহরটিকে অন্য শহরগুলোর থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। এখানে চীনের অন্যান্য অনেক শহরের মতো তুষারপাত হয় না। দেশটির দূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে শহরটিকে যতটা সম্ভব সবুজ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, আর সেই প্রচেষ্টার ছাপ চোখে পড়ে চারদিকে। যেদিকেই তাকানো যায়, সবুজের সমারোহ। এখানকার সড়ক ব্যবস্থাও অত্যন্ত পরিকল্পিত। পথচারী, সাইকেল ও মোটরযানের জন্য আলাদা লেন রয়েছে এবং সবাই নিয়ম মেনে চলাচল করে। এমনকি জেব্রা ক্রসিংয়ে কোনো পথচারী দাঁড়ালে পাবলিক বাসও থেমে যায়।

বিজ্ঞাপন

চীনে পড়াশোনার পরিবেশে এক কথায় অতুলনীয়। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন মেধা গড়ার কারখানা, লাইব্রেরিগুলোতে গেলে বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। সেখানে প্রবেশ করলে বইয়ের পাতা ওল্টানোর শব্দ আর কিবোর্ডের টিপটাপ আওয়াজ ছাড়া তেমন কোনো শব্দই শোনা যায় না। বসার জন্য আগে থেকেই আসন নিবন্ধন করতে হয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ এবং লক্ষ লক্ষ বইয়ের সমাহারে লাইব্রেরি যেন জ্ঞানের এক ভিন্ন জগৎ।

চীনের খাবার উৎসবেও খুঁজে পাওয়া যায় দেশটির আরেক সৌন্দর্য। বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী উৎসবে তাদের সংস্কৃতি আরো রঙিন হয়ে ওঠে। এখানে উৎসব মানেই পরিবার-পরিজনের মিলনমেলা এবং টেবিলজুড়ে নানা রকম সুস্বাদু খাবারের আয়োজন। আমি এখানকার স্বাস্থ্যকর ডাম্পলিং এবং বিভিন্ন ধরনের নুডলস খুব উপভোগ করি। ভাত ও নুডলস তাদের প্রধান খাদ্য। তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় তরকারি রান্নার ক্ষেত্রে। তারা অধিকাংশ সবজি খুব কম মসলা ব্যবহার করে বা সিদ্ধ করে খায়, যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।

Amardesh_Xiamen

এখানকার মানুষ সম্পর্কে অনেকেই নাটক, সিনেমা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কিছু ধারণা পেয়ে থাকেন। চীনের মানুষের সংস্পর্শে না আসা পর্যন্ত চীনের প্রকৃত তথ্য সম্পর্কে জানা যায় না। ভাষাগত জটিলতার কারণে প্রথম দিকে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে। তবে বর্তমানে অনেক চীনা তরুণ-তরুণী ইংরেজিতে দক্ষ হয়ে উঠছেন। পাশাপাশি দেশটির সরকারও বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তৈরি করায় চীনের ভাষা শেখাও আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে।

চায়নিজ ভাষা শেখা যেমন ভবিষ্যৎ কর্মজীবন গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, তেমনি এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও জীবনধারা বোঝারও একটি চমৎকার উপায়। আমাকে শুধু চায়নার মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যই আকর্ষণ করে না, বরং এখানকার মানুষের কঠোর পরিশ্রম, ভদ্রতা, অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন আমাকে চায়নার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে রেখেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে বর্তমানে ভাষা অনুবাদও অনেক সহজ হয়ে গেছে, ফলে যোগাযোগ আর আগের মতো বড় কোনো বাধা নয়।

চীনের উন্নত প্রযুক্তির কথা না বললেই নয়। বলা যায়, কাগজভিত্তিক অনেক কার্যক্রম প্রায় বিলুপ্তির পথে। উইচ্যাট এবং আলিপে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং চীনের মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ ব্যাংকে অর্থ রাখে, কিন্তু সেই অর্থের অধিকাংশ লেনদেন মোবাইলের মাধ্যমেই সম্পন্ন করে।

এখানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় প্রবেশের জন্য মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ (ফেস রিকগনিশন) প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করেছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে স্থাপন করা হয়েছে অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা। কেউ নিয়ম ভঙ্গ করলে প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত তাকে শনাক্ত করা হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এই প্রযুক্তিনির্ভর ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা চায়নার আধুনিক উন্নয়নের একটি অনন্য উদাহরণ।

চীনের আধুনিক কেনাকাটার ব্যবস্থা দেখে আমি অভিভূত। এমন কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস নেই যা ঘরে বসে অনলাইনে কেনা যায় না। তাওবাও এবং পিনদুওদুও শুধু অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্মই নয়, বরং তুলনামূলক কম দামে মানসম্মত পণ্য কেনার সুযোগও করে দেয়। অর্ডার করার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পণ্য ঠিক আপনার ঠিকানায় পৌঁছে যায়।

চীনের উন্নত যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা কেনাকাটা এবং দৈনন্দিন জীবনকে আরও সহজ ও সুবিধাজনক করে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে বের হলেই বাস স্টেশন, সাবওয়ে স্টেশন, বিআরটি স্টেশন, সাইকেল স্টেশন—সবকিছু হাতের নাগালে পাওয়া যায়। আর যদি দ্রুত কোথাও যেতে হয়, তাহলে মোবাইল ফোনের একটি কলেই চলে আসে দিদি ট্যাক্সি। ফলে গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

আমি এমনই একটি দেশের স্বপ্ন দেখি, যে দেশের উন্নয়নের যাত্রার শুরুটা একসময় বাংলাদেশের মতোই ছিল, কিন্তু আজ কঠোর পরিশ্রম, সঠিক পরিকল্পনা এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চায়না অনেক দূর এগিয়ে গেছে। একটি পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও উন্নত দেশ গড়ার পাশাপাশি পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করার যে শিক্ষা চীন দিয়েছে, তা আমাদের জন্য একটি অনন্য উদাহরণ। আমি বিশ্বাস করি, চীনের ইতিবাচক দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশও আরও সমৃদ্ধ ও উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।


এমএমআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...