এক কঠিন অস্তিত্বের অবয়বের নাম ‘বাবা’, যার সারাটা জীবন কেটে যায় ‘বাবা’ শব্দের ভার বহন করতে করতে, সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে আর একবুক ভালোবাসার পরশ এঁকে দিতে। বাবা দিবসে বাবার সেই অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা ও কয়েকজন শিক্ষার্থীর ‘না-বলা কথা’।
না-বলা কথায় বাবা

বাবা, তোমায় নিয়ে কত না-বলা কথা জমে আছে আমার ডায়েরির পাতায়। কেন যেন তোমার আর আমার মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল-সমান দূরত্ব গড়ে ওঠে। ছোটবেলায় তোমার রুক্ষ হাতের কোমল স্পর্শ দিয়ে আমায় হাঁটতে শিখিয়েছ, গম্ভীর মুখের কঠোরতা দিয়ে সঠিক পথ দেখিয়েছ। তোমার কঠোর শাসনের আড়ালে যে অসীম ভালোবাসা লুক্কায়িত ছিল, তা অনেক দেরিতে বুঝতে পেরেছি। তবে আজ কেন আমাদের মাঝে এতটা নীরবতার সৃষ্টি হলো! পরিবারের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানোর জন্য তুমি নিজের সব শখ ও স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছ। বাবা, তোমার নীরব সংগ্রাম আর অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়েই গড়ে উঠেছে আমার সুখের সাম্রাজ্য। সেই সাম্রাজ্যে সুরক্ষিত থেকে আমি কখনো বুঝিনি বাইরের রোদের প্রখরতা, বৃষ্টির তীব্রতা আর ঝড়ঝাপটার ব্যাকুলতা। বাবা, আমি তো তোমার জন্য কিছুই করতে পারিনি। এমনকি তোমার প্রতি যথাযথ আনুগত্য প্রকাশ করতেও আমি ব্যর্থ, বাবা। আমায় ক্ষমা করো। বাবা, এই না-বলা কথাগুলো আমি তোমাকে বলতে চাই; জানাতে চাই, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি।
শামসুল আলম শিহাব
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
‘বাবার নীরব ভালোবাসা’

সংসারে মা যদি হন শীতল ছায়া, তবে বাবা হলেন সেই ছায়ার ছাদ, যা তপ্ত রোদ্দুর আর ঝড়ঝাপটা থেকে আমাদের আগলে রাখে। মায়ের ভালোবাসা আমরা প্রতিনিয়ত অনুভব করি তার সস্নেহ স্পর্শে, কান্নায়, কিংবা কড়া শাসনে; আর বাবার ভালোবাসা যেন এক গভীর সমুদ্র—শান্ত, নিথর, অথচ অতল। বাবারা ভালোবাসেন নীরবে, এক অদ্ভুত আড়ালে।
শৈশবে আমরা অনেকেই বাবাকে একটু গম্ভীর, কিছুটা দূরত্বের মানুষ মনে করে বড় হই। মা যেখানে আবদার পূরণের প্রধান মাধ্যম, বাবা সেখানে যেন একটু হিসেবি। নিজের ক্ষয়ে যাওয়া জুতো জোড়া না বদলে যিনি সন্তানের জন্য ব্র্যান্ডের জুতো কিনে আনেন, তিনিই বাবা। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষটিও বাবার অবর্তমানে নিজেকে অসহায় হিসেবে আবিষ্কার করে; কারণ বাবা থাকা মানে মাথায় এক অদৃশ্য রাজমুকুট থাকা। অসুখ হলে মা মাথায় জলপট্টি দেন, রাত জেগে পাশে বসে থাকেন। কিন্তু মধ্যরাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন নিঃশব্দে সন্তানের গায়ের কাঁথাটা টেনে দেওয়া, কিংবা পরম মমতায় কপালে হাত রেখে মনে মনে আল্লাহর কাছে দীর্ঘায়ু কামনা করার নামই বাবা। তাই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই বাবাকে আগলে রাখুন; আর জড়িয়ে ধরে ‘না-বলা কথাটি’ বলে ফেলুন।
ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
শাসনের ছায়াতলে ভালোবাসার পরশই বাবা

‘বাবা’ নামক ব্যক্তির প্রতিচ্ছবি শুধুই বাবা নিজেই। ‘বাবা’ শব্দটা শুনলেই মনে হয় এই বুঝি বকা দেবেন! এ কারণে তাকে দেখলেই ভয় হতে থাকে অনেক সন্তানের। বাবার কড়া একটি শাসন মায়ের কড়া শত বকার সমান। বাবা শাসন করেন বলেই বাবার প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা থাকে আমাদের সবার। বাবা শাসন করেন সন্তানের মঙ্গল কামনায়। বাবার সেই শাসনকে অবমামনা করলে উল্টো সন্তানরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ সে শাসনের সঙ্গে মিশে থাকে ভালোবাসার ছোঁয়া।
যখন বাবা পৃথিবীতে থাকেন না, সেই সময়ে দুনিয়াতে সন্তানের সঠিকভাবে জীবনযাপন করা যেন এক বড় সংগ্রাম হয়ে ওঠে। বাবার বলা প্রতিটি কথা বাণীর মতো আমাদের কাছে পরম শিক্ষণীয়। বিপদে পড়লে বাবার গুরুত্বটা আমরা বেশি বুঝতে পারি। বাবার শাসনে থাকে শুধুই সঠিক পথচলার নির্দেশনা।
আফিয়া আলম
শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
বাবা, এক অনির্বাণ আলো

‘বাবা’ ছোট্ট একটি শব্দ; অথচ এর গভীরতা আকাশের মতো বিস্তৃত। জীবনের প্রতিটি ধাপে দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্যভাবে একজন বাবা সন্তানের পাশে থাকেন শক্তির উৎস হয়ে। তার ভালোবাসা অনেক সময় মুখে প্রকাশ পায় না; কিন্তু দায়িত্ব, ত্যাগ আর নিরলস পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তা প্রতিনিয়ত অনুভূত হয়।
শৈশবে বাবার হাত ধরে হাঁটতে শেখা থেকে শুরু করে জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া পর্যন্ত তিনি হয়ে ওঠেন সন্তানের সবচেয়ে বড় ভরসা। নিজের কষ্ট, ক্লান্তি কিংবা অপূর্ণ স্বপ্নগুলো আড়াল করে তিনি সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চান। সন্তানের সাফল্যে তার চোখে ফুটে ওঠে গর্ব। আর ব্যর্থতার সময়ে তিনি নীরবে সাহস জোগান সামনে এগিয়ে যাওয়ার। বাবারা ভালোবাসেন নিঃশব্দে, আগলে রাখেন অগোচরে। সংসারের শত ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নই তাদের সবচেয়ে বড় প্রেরণা। তাই বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন, তিনি জীবনের পথচলার এক অনির্বাণ আলো, যার আলো কখনো নিভে যায় না। বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
নাদির আহমেদ
শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

