আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জামায়াত নেতার বিস্ফোরক মন্তব্যে ক্ষুব্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতিনিধি, ঢাবি

জামায়াত নেতার বিস্ফোরক মন্তব্যে ক্ষুব্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সম্পর্কে ‘মাদকের আড্ডাখানা ও বেশ্যাখানা’ ছিল- এমন মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. শামীম আহসান। তার এই বক্তব্যকে ‘কুরুচিপূর্ণ, অশালীন ও অর্বাচীন’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ডাকসু।

গত শনিবার (২৪ জানুয়ারি) রাতে বরগুনার পাথরঘাটার কাটাখালী এলাকায় বরগুনা-২ আসনে জামায়াত প্রার্থী সুলতান আহমেদের নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে শামীম আহসান বলেন, “ডাকসু নির্বাচনের আগে এটি মাদকের আড্ডা ও বেশ্যাখানা ছিল, ইসলামী ছাত্রশিবির ক্ষমতায় এসে তা পরিবর্তন করেছে।”

বিজ্ঞাপন

তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। জনসংযোগ দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ, অশালীন ও অর্বাচীন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এই বক্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমর্যাদা, সুনাম, ঐতিহ্য ও সম্মানকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। অবিলম্বে বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয় বিবৃতিতে।

ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদ জামায়াত নেতার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তার উদ্দেশে একটি ‘খোলা চিঠি’ বিবৃতি দিয়েছেন। চিঠিতে তিনি বলেন, সমাজসেবা সম্পাদক রমনা জোন পুলিশের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় বহিরাগত কিছু মাদক ও পতিতা সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছেন- এটি সত্য। কিন্তু ঢালাওভাবে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুকে ‘মাদকের আড্ডা ও বেশ্যাখানা’ বলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও চরম অবমাননাকর।

তিনি আরও বলেন, শামীম আহসানকে অবিলম্বে জাতির সামনে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মানহানির অভিযোগে মামলা করা হবে।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাত ৮টার দিকে ডাকসু সদস্য হেমা চাকমার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে শামীম আহসানের কুশপুত্তলিকা দাহ করে এমব মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান।

প্রতিবাদ সমাবেশে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট বক্তব্য ও রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে অবমাননাকর ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়ে আসছে।

তারা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীরা ঐতিহাসিক সব গণআন্দোলনে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যার সর্বশেষ উদাহরণ জুলাই অভ্যুত্থান। অথচ নারীদের পেশা, চরিত্র ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা চরম নিন্দনীয়।

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা বলেন, আমি কোনো বিশেষ পরিচয় বা পথ-পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করে নয়; বরং একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী রাজনীতিক ও প্রান্তিক অঞ্চল থেকে উঠে আসা নারী শিক্ষার্থী হিসেবে কথা বলছি। বাংলাদেশে এখনো মেয়েদের উচ্চশিক্ষা- বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া- নিয়ে সামাজিক ভীতি ও কুসংস্কার রয়েছে। নারী শিক্ষার্থীরা কথা বললে বা প্রতিবাদ করলে পরিকল্পিতভাবে তাদের চরিত্রহনন করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ কথা বলার সাহস না পায়।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-ধর্মীয় গোষ্ঠী নিজেদের একমাত্র সত্যের ধারক মনে করে এবং ভিন্নমত দমন করতে নারী শিক্ষার্থীদের চরিত্র, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অপপ্রচার চালায়। যৌক্তিক আন্দোলন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে তারা সরাসরি চরিত্রহানির রাজনীতি শুরু করে।

এসময় শিক্ষার্থীরা ওই জামায়াত নেতাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নারী শিক্ষার্থীদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।

তীব্র সমালোচনার মুখে এদিন রাত সাড়ে ৯টায় নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে সেই বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন শামীম আহসান।

তিনি বলেন, তার বক্তব্যে অনেকে মর্মাহত হয়েছেন এবং শব্দচয়ন ও প্রকাশভঙ্গিতে অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রশাসনের ধারাবাহিক উদ্যোগে এসব অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই প্রেক্ষাপট তুলে ধরতেই তিনি বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।

দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল ও সমীচীন ভাষা ব্যবহার করবেন। একই সঙ্গে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ এবং এর শিক্ষার্থীরা দেশ ও জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন