মূল : ড. মোহর আলি অনুবাদ : গুলজার গালিব
পূর্বদেশে বাণিজ্যের ধারাবাহিকতায় আরব মুসলমানরা বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে, বিশেষত সমুদ্রবন্দরগুলোয় এসেছিল। তারা এখানকার রপ্তানিযোগ্য পণ্যসামগ্রী—চাল, আগরকাঠ, সুতির কাপড় ইত্যাদির খুব কদর করত। বাংলার সঙ্গে প্রাচীন মুসলমানদের এই বাণিজ্যিক যোগাযোগ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দ্বারাও সমর্থিত। ১৯৩৭-৩৮ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী জেলার প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপনা পাহাড়পুরে খননকালে আব্বাসী খলিফা হারুনুর রশীদের (৭৮৬-৮০৯ খ্রি.) একটি মুদ্রা পাওয়া যায়। মুদ্রাটির তারিখ ১৭২ হি./৭৮৮ খ্রি.। (Memoirs of the Archaeological Survey of India, KN Dikshit, খণ্ড: ৫৫, পৃষ্ঠা: ৮৭)
কুমিল্লা জেলার ময়নামতির ধ্বংসাবশেষ থেকেও দুটি আব্বাসী যুগের মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়। (Recent Archaeological Discoveries in East Pakistan: Mainamati, F.A. Khan, পৃষ্ঠা: ১১)। যুক্তিসংগতভাবে ধারণা করা যায়, কোনো মুসলিম বণিক অথবা ধর্ম প্রচারকই দ্বিতীয় বা তৃতীয় হিজরি শতাব্দীতে (অষ্টম বা নবম খ্রিষ্টাব্দে) এগুলো বাংলার অভ্যন্তরে নিয়ে এসেছিল।
এছাড়া রত্নপালের (তৃতীয়-চতুর্থ হি./নবম-দশম খ্রি.) আমলের একটি শিলালিপিতে তাজিক শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। (জেএএসবি ভলিউম: ৬৭ (১৮৯৮), পৃষ্ঠা: ১১৬)। ফারসি তাজিক (তাইয়ি গোত্রের কোনো ব্যক্তি) থেকে শব্দটি উৎপন্ন। দূরপ্রাচ্যে, বিশেষত চীনে, আরব বণিকদেরও এর কাছাকাছি নামে (তা-শিহ) অভিহিত করা হতো। (Arab Seafaring in the Indian Ocean in Ancient and Early Medieval Times, George Fadlo Hourani, বই থেকে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা: ৬৬)
আরব বা মুসলিম বণিকদের সঙ্গে এই পরিভাষার সংযুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণ হলো, আব্বাসি খলিফারা আরব ও পারসিকদের সংমিশ্রণে উৎসাহিত করেছিলেন। এর ফলেই আমরা দেখি, নবম শতকে দূরপ্রাচ্যের সঙ্গে সমুদ্র-বাণিজ্য সম্পর্কিত আরবি দলিলে পারসিকদের তুলনায় মুসলমান ও আরব শব্দের উল্লেখ বেশি পাওয়া যায়। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৬৫-৬৬) তাই উল্লিখিত শিলালিপিতে পাওয়া তাজিক শব্দটি আসলে তৎকালীন আরব বা মুসলিম বণিকদের দিকেই ইঙ্গিত করে।
প্রথম দিকে আগত আরব বণিকরা বাংলায় বা উপকূলীয় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল কি না, তা নিয়ে বিদ্বানদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, আরবরা যখন মালাবার, সিলন, জাভা, সুমাত্রা, মালয় উপদ্বীপসহ তাদের বাণিজ্যপথের নানা স্থানে বসতি স্থাপন করেছিল, তখন বাংলার উর্বর উপকূলীয় অঞ্চলেও আরবের স্থায়ী বসবাস ছিল—এই সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করে দেওয়া যায় না। এখানে তিনটি বিষয় স্মরণযোগ্য—
১. মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দ্বন্দ্ব কখনো কখনো ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠীগুলোকে নিজ ভূখণ্ড থেকে বহুদূরে, উন্নত যোগাযোগব্যাবস্থা-সম্পন্ন বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করত। যেমন উমাইয়া খেলাফতের অবসানের আগেই কিছু শিয়া মুসলমান খোরাসান থেকে নির্যাতিত হয়ে চীনের একটি দ্বীপে বসতি স্থাপন করেছিল। (Arab Seafaring in the Indian Ocean in Ancient and Early Medieval Times, জর্জ এফ হাওরানি, পৃ. ৬৩)
২. নিয়মিত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য তৎকালীন বড় ব্যবসায়ীরা দূরবর্তী বন্দরগুলোয় নিজস্ব লোক বা প্রতিনিধিদের স্থায়ীভাবে রাখাকে জরুরি মনে করত।
৩. ঝড় বা জাহাজডুবির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কখনো কখনো আরবরা অচেনা দেশে আশ্রয় নিতে বা স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হতো। (কিতাবু আজাইবিল হিন্দ, পৃষ্ঠা: ১৬৫-১৬৮)। চট্টগ্রাম উপকূল সম্পর্কে এমন একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্রাপ্ত একটি প্রাচীন আরাকানি ইতিহাসে বলা হয়েছে, আরবদের একটি জাহাজ আরাকানের উপকূলে ডুবে যায়। আরাকানের রাজা মা-বা-তোইং (৭৮০-৮১০ খ্রি.) তখন বেঁচে যাওয়া আরবদের কয়েকটি গ্রামে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন। (জেএএসবি-১৮৪৪, ভলিউম: ১৩, পৃষ্ঠা: ৩৬)। বর্তমানে আরাকান হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী এলাকা। প্রাচীনকালে চট্টগ্রামের এই অঞ্চল আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকাও অস্বাভাবিক নয়। সুতরাং আরবরা আরাকানের উপকূলে জাহাজডুবিতে পতিত হয়ে চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করেছিল বলাটা অযৌক্তিক নয়।
এই বসতিই ধীরে ধীরে মুসলিম কলোনিতে পরিণত হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। কেননা আরেকটি আরাকানি ইতিহাসে বলা হয়েছে, প্রায় ১৫০ বছর পরে রাজা চু-লা-তোইং সান-দা-য়া (৯৫১-৯৫৭ খ্রি.) থু-রা-তান নামক এক ব্যক্তিকে পরাজিত করে চট্টগ্রামে একটি বিজয়স্মারক নির্মাণ করেন। (প্রাগুক্ত)। থু-রা-তান ছিলেন প্রভাবশালী ব্যক্তি, তিনি কোনো কারণে আরাকানের রাজার বিরাগভাজন হয়ে পড়েছিলেন। তবে থু-রা-তান নামটির উল্লেখ ওই অঞ্চলের অন্য কোনো উৎসে পাওয়া যায় না। এই আরাকানের ইতিহাসের ভিত্তিতে ড. মুহাম্মদ এনামুল হক ব্যাখ্যা দিয়েছেন—চট্টগ্রামে মুসলিম বসতিটি ক্রমেই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে এবং একসময় তারা নোয়াখালী-চট্টগ্রাম উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ে একটি স্বাধীন মুসলিম রাজ্য গঠন করে। সেই মুসলিম শাসকই ছিলেন সুলতান। তার মতে, থু-রা-তান নামটি আসলে আরবি শব্দ সুলতান-এর আরাকানি উচ্চারণ। (পূর্ব পাকিস্তানে ইসলাম, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, পৃষ্ঠা: ১৭; আরাকান রাজ্যসভায় বাংলা সাহিত্য, পৃষ্ঠা: ৩)
যদিও এ অঞ্চলে প্রাচীন মুসলিম রাজ্যের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে (Early Muslim Contact with Bengal, AH Dani), তারপরও ড. হকের ব্যাখ্যা অত্যন্ত যুক্তিসংগত। ড. এমএ রহিমও বলেছেন, ‘থু-রা-তান’ শব্দটিকে সুলতান হিসেবে পাঠ করা মোটেও কল্পনাপ্রসূত নয়। হিন্দু, বৌদ্ধ বা আরাকানি সংস্কৃতিতে এমন কোনো নাম বা উপাধি পাওয়া যায় না। অতএব, থু-রা-তান যে আসলে সুলতান শব্দের আরাকানি উচ্চারণ, এটা বলাই যৌক্তিক।’ (Social and Cultural History of Bengal, MA Rahim, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৪)। তার মতে, ‘চট্টগ্রাম ছিল অত্যন্ত সুবিধাজনক একটি বন্দর। তাই আরব বণিকরা এখানকার মূল্যবান পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য কয়েকজন স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েছিলেন। শিক্ষিত, জ্ঞানী ও বিত্তশালী হওয়ায় তারাই বন্দরনগরীতে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। এই সুলতান আসলে চট্টগ্রামের আরব বণিক সম্প্রদায়ের প্রধান ছিলেন, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামজুড়ে বিস্তৃত কোনো রাজ্যের শাসক ছিলেন না।’ (প্রাগুক্ত)
তবে যিনি সুলতান (থু-রা-তান) ছিলেন, তিনি হতে পারেন আরব বণিকদের নেতা, হতে পারেন প্রাথমিক মুসলিম রাষ্ট্রের সুলতান, অথবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো ব্যক্তি। এ বিষয়ে গবেষকদের বিভিন্ন মত ও মতামত রয়েছে। তবে তারা একটি বিষয়ে একমত যে, মুসলিম সেনাপতিদের রাজনৈতিক জয়লাভের অনেক আগেই একদল আরব মুসলমান বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে, বিশেষত চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিল। এ প্রসঙ্গে এর আগে আরাকানের ইতিহাসের দুটি দলিল উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া এ বিষয়ে বেশ শক্তিশালী পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়।
ক. চট্টগ্রাম নামটি সম্ভবত আরবি উৎস থেকে এসেছে। এটা গঙ্গার (পদ্মা) প্রশস্ত মোহনায়, যেখানে কিছুটা উজানে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা এসে মিলিত হয়েছে, তার পূর্ব তীরে অবস্থিত। প্রাচীনকালে এটা বর্তমান চট্টগ্রামের অবস্থানের আরো কাছাকাছি ছিল। ভৌগোলিক কারণে প্রাচীন যুগে একে গঙ্গার উপকূলবর্তী বন্দর হিসেবেই চিহ্নিত করা হতো। এমন বর্ণনা দিয়েছেন ইবনে বতুতা (Ibn Battuta, HAR Gibb সম্পাদিত, পৃষ্ঠা: ২৬৭) ও পঞ্চদশ শতাব্দীর চীনা পরিব্রাজকরা। (Coins and Chronology of the Early Independent Sultans of Bengal, NK Bhattasali, পৃষ্ঠা: ১৩৬)। আকবরের মন্ত্রী ঐতিহাসিক আবুল ফজলও একই কথা বলেছেন। (আইন-ই-আকবরি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৩৩)। সুতরাং এটা অনুমান করা মোটেই শক্ত নয় যে, আরব বণিকরা যখন এই বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল, তখন তারাও একে গঙ্গার তীরবর্তী বন্দর বা আরবিতে ‘শাতু গঙ্গা’ নামে অভিহিত করেছিল। পরবর্তী কালে এই অভিব্যক্তি স্থানীয় রূপে ছাতগাঁও বা সদকাওয়াঁ হয়ে যায় এবং অবশেষে ইংরেজি রূপান্তরে Chittagong হয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই নামটির উৎপত্তি যেভাবেই হোক না কেন, এর ইতিহাস দশম শতকের আগে পাওয়া যায় না—যে সময়েই আরবদের পূর্বমুখী বাণিজ্যযাত্রায় এই এলাকায় আসার প্রমাণ মেলে।
অনুবাদ : গুলজার গালিব
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ইসরাইলে আগাম হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি ইরানের