মাসখানেক আগের কথা। সন্ধ্যার পর আম্মু রান্নাঘরে কাজ করছেন। হঠাৎ আমাকে ডাকেন। আম্মুর ডাকের ধরন শুনেই বুঝে যাই এই ডাকটা কীসের জন্য। টেবিল ছেড়ে দ্রুত উঠতে গিয়ে দুই জায়গায় হোঁচট খাই, তবু না থেমে রান্নাঘরে গিয়ে হাজির হই। কারণ আম্মুর ডাকটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গিয়ে দেখি আম্মু ওপরের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বোঝার চেষ্টা করছি বিষয়টা কী?
আম্মু!
অহনা, কান পেতে শোনো তো এটা কীসের শব্দ?
আম্মুর কথায় আমার হাত-পা কাঁপছে। আমাদের ঘরে এসব কিছুতে আম্মু খুবই বুদ্ধিমান, আজ কিনা আমার কাছে জানতে চাচ্ছেন! আম্মুর পাশে গিয়ে কান পেতে আছি আমিও। রান্নাঘরের ওপরের তাকে একটা রাইস কুকার আর একটা প্রেশার কুকার প্যাকেট করে রাখা। মনে হলো শব্দটা সেখান থেকেই আসছে।
আম্মু, মনে হয় পাখি বাসা বেঁধেছে।
হতে পারে, কারণ পাশেই খোলা জানালা।
যেই আমি রুমের দিকে হাঁটা দিলাম, অমনি আবার ডাক ভেসে এলো।
অহনা মা, তুই একটু ওপরে উঠে কান পেতে শুনবি শব্দটা আসলে কোথা থেকে আসছে?
প্লিজ মা, তোমার হাতে ধরি, আমাকে এটা করতে বোলো না!
দেখো না, আমি যে মোটা আর ভারী মানুষ, উঠলে যদি পড়ে যাই!
আম্মুর প্রতি মায়া হয়ে সাহস নিয়ে উঠলাম। যে আমি তেলাপোকাকে দেখলে ১০ হাত দূরে সরে যাই, সেই আমি আজ দোয়া পড়তে পড়তে একটু ওপরে উঠে বুঝলাম শব্দটা প্যাকেটগুলোর ভেতর থেকেই আসছে। এটা বলেই আমি সোজা রুমে। কিন্তু আম্মুর ঘুম নেই এই শব্দ নিয়ে।
সকালে আমেনা খালা যখন এসেছে, আমি বাসায় নেই। খালা ওপর থেকে প্যাকেটগুলো নামায়। প্রেশার কুকারের প্যাকেটের পেছনে বড় একটা ছিদ্র, ভেতর থেকে একে একে পাঁচটা ইঁদুরের বাচ্চা বের হলো। সঙ্গে অনেক কাগজের টুকরো। আমেনা খালা সব পরিষ্কার করে দিয়েছে বলে আম্মু শান্তি পেলেন। আম্মু খুব খুশি ইঁদুরের বাচ্চাগুলো ফেলে দিয়ে।
পরের রাতে আমি পড়ছি, আম্মু শুয়ে পড়েছেন। রান্নাঘরে সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ভয়ে আমি যাচ্ছি না। আম্মুকে বলতেই বললেন রান্নাঘরের লাইট জ্বালিয়ে দিতে। আমিও তাই করি। লাইট জ্বালানোর পর আর কোনো শব্দ নেই। এভাবে দুই দিন কেটে গেল।
আম্মু ওয়াশিং মেশিন চালু দিতে গিয়ে দেখেন অন হয় না। দ্রুত মেকানিক্যাল লোককে কল দেন। উনি সব সময় আমাদের এসব কাজ করেন। কল পেয়েই চলে আসেন। ওয়াশিং মেশিন খুলে দেখেন ইঁদুর ভেতরের সব তার কেটে কুটিকুটি করে রেখেছে । মেশিনের পাশে খুব ছোট একটা ছিদ্র ছিল, সেটা কেটে বড় করেছে, এরপর ভেতরে গিয়ে সব তার কুটিকুটি। আম্মুর তো মাথায় হাত। ৪ হাজার টাকা দিয়ে মেশিন ঠিক করেন। সকালে আমেনা খালা এসে ঘটনা শুনল। শুনেই বলল,
আফা গো, সেদিন যে আমরা ওর বাচ্চাগুলো ফেলে দিয়েছি, সেই প্রতিশোধে ও মেশিনের তার কেটে ফেলেছে।
আম্মুও তাই বিশ্বাস করেছেন, ইঁদুর প্রতিশোধ নিতেই এই কাজ করেছে। অবশ্য আমারও তাই মনে হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

