একসময় দেশে মোটরসাইকেল ছিল বিলাসিতা। এখন এটি অনেকের কাছে প্রয়োজনীয়তা। ঢাকার রাস্তায় বের হলে মনে হয় শহরের অর্ধেক মানুষ বাইকে চলাফেরা করছেন। অফিসগামী কর্মচারী, ছাত্র, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, পুলিশ—সবার জীবনেই এখন বাইক একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আসলে দোষও দেওয়া যায় না। যে শহরে ১০ কিলোমিটার পথ যেতে দুই ঘণ্টা লেগে যায়, সেখানে মোটরসাইকেল অনেকের কাছে স্বাধীনতার প্রতীক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে ঝুলে থাকার চেয়ে বাইকে চড়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু একজন অর্থোপেডিক সার্জন হিসেবে আমার কাছে বাইকের আরেকটি চেহারাও পরিচিত। প্রতিদিন চেম্বার কিংবা হাসপাতালে এমন অনেক রোগী আসেন, যাদের ঘাড়ব্যথা, কোমরব্যথা, কবজির ব্যথা বা হাঁটুর সমস্যার পেছনে নীরব ভূমিকা পালন করছে দীর্ঘদিনের বাইক চালানো। বিশেষ করে, ঢাকার মতো শহরে যেখানে প্রতিনিয়ত ব্রেক, ক্লাচ, গর্ত, স্পিডব্রেকার আর যানজটের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়।
দীর্ঘক্ষণ বাইক চালালে ঘাড়ের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকের ঘাড়ে ব্যথা (সার্ভিক্যাল স্পন্ডিলোসিস), কাঁধে ব্যথা, কিংবা হাতে ঝিনঝিনে অনুভূতি (কারপাল টানেল সিন্ড্রোম) শুরু হয়। একইভাবে কোমরের ওপর বারবার ঝাঁকুনি ও কম্পনের কারণে কোমরব্যথা, এমনকি ডিস্কের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। অনেকেই মনে করেন স্পোর্টস বাইক মানেই ভালো বাইক। বাস্তবে অর্থোপেডিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি উল্টোও হতে পারে। অতিরিক্ত সামনে ঝুঁকে বসতে হয় এমন বাইকে ঘাড়, কবজি ও কোমরের ওপর চাপ অনেক বেশি পড়ে বরং ঢাকার ট্রাফিকের জন্য তুলনামূলক সোজা হয়ে বসা যায়, ভালো সাসপেনশনযুক্ত এবং আরামদায়ক সিটের সাধারণ কমিউটার বাইকই শরীরের জন্য বেশি উপযোগী। বাইকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মেরুদণ্ড এবং মাথায় আঘাত। বছরের পর বছর ট্রমা রোগী দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে ভয়ংকর আঘাতগুলো হয় মাথায় এবং মেরুদণ্ডে। হাতের হাড় ভাঙলে জোড়া লাগানো যায়, পায়ে রড বসানো যায় কিন্তু মস্তিষ্কের বা মেরুদণ্ডের স্পাইনাল কর্ডের গুরুতর আঘাতের ক্ষতি অনেক সময় আর পুরোপুরি পূরণ করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডের স্নায়ু (স্পাইনাল কর্ড) ক্ষতিগ্রস্ত হলে চার হাত-পা বা দুই পা আজীবন অবশ হয়ে যাওয়া (প্যারালাইসিস) পর্যন্ত হতে পারে। মস্তিষ্কের আঘাতে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির প্রধান কারণ মস্তিষ্কের আঘাত। মজার বিষয় হলো, অনেকেই লাখ টাকার বাইক কিনতে রাজি কিন্তু ভালো মানের একটি হেলমেট কিনতে কষ্ট হয়। কেউ কেউ আবার হেলমেট মাথায় রাখেন ঠিকই, কিন্তু স্ট্র্যাপ লাগান না। দুর্ঘটনার সময় সেটি উড়ে গেলে সেই হেলমেটের উপকারিতা অনেকটাই হারিয়ে যায়। হেলমেট আসলে একটি ছোট্ট বডিগার্ড। দুর্ঘটনার সময় মাথায় আসা আঘাতের শক্তি শোষণ করে মস্তিষ্ককে রক্ষা করার চেষ্টা করে। গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে হেলমেট মাথার গুরুতর আঘাত এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমায় প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ।
বাইক আমাদের সময় বাঁচায়, কর্মক্ষমতা বাড়ায় এবং চলাচল সহজ করে। কিন্তু সঠিক দেহভঙ্গি, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা ছাড়া এটি ঘাড়, কোমর, হাঁটু এবং মাথার জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। মনে রাখুন, রাস্তায় আপনি যত দক্ষ চালকই হন না কেন, আপনার চারপাশের সবাই দক্ষ নাও হতে পারে। ভালো বাইকার সে নয়, যে দ্রুত চালায়; ভালো বাইকার সে, যে নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসে।’
লেখক : সহকারী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি)
অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, নিটোর, ঢাকা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


মানসিক সুস্থতার ৮টি উপায়