ভাইরাল হলেই কি সত্য

ভাইরাল হলেই কি সত্য

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ নানা ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছবি, ভিডিও কিংবা একটি লেখা পৌঁছে যাচ্ছে হাজারো মানুষের কাছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই দ্রুতগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, বাড়িয়েছে তথ্য পাওয়ার সুযোগ। তবে একই সঙ্গে বেড়েছে গুজব, মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্তিকর প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগাম বিচার করে ফেলার প্রবণতা। প্রশ্ন হলো, ভাইরাল হলেই কি কোনো তথ্য সত্য হয়ে যায়?

গুজব এখন হাতের মুঠোয়

বিজ্ঞাপন

আগে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগত। এখন একটি মুঠোফোনই যথেষ্ট। কেউ একটি দাবি করলেন, অন্যজন যাচাই না করেই তা ছড়িয়ে দিলেন। এরপর একই তথ্য বিভিন্ন পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত হিসাবে প্রকাশ হতে থাকল। একপর্যায়ে মানুষ ভাবতে শুরু করল, এত জায়গায় যখন খবরটি এসেছে, নিশ্চয়ই সত্য। এভাবেই একটি মিথ্যা তথ্য ধীরে ধীরে মানুষের কাছে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কখনো পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, কখনো অন্য দেশের ভিডিওকে দেশের ঘটনা বলে প্রচার করা হয়। আবার সত্য কোনো ঘটনার সঙ্গে মনগড়া তথ্য যোগ করে তৈরি করা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গল্প।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন গুজবের হাতিয়ার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জন্য বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। লেখা তৈরি, ছবি বানানো, তথ্য বিশ্লেষণ, শব্দ, ভিডিও তৈরিসহ নানা কাজে এর ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু এর অপব্যবহারও হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বাস্তবের মতো ছবি তৈরি করা যায়, কারো কণ্ঠস্বরের আদলে ভুয়া বক্তব্য বানানো যায়, এমনকি একজনের মুখ অন্য ব্যক্তির ভিডিওতে বসিয়ে দেওয়া সম্ভব। ফলে কেউ এমন কথা বলেছেন বা এমন কাজ করেছেন, এমন ধারণা তৈরি হতে পারে, যা বাস্তবে কখনো ঘটেনি।

ডিপফেকের ভয়াবহতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত বাস্তবসম্মত ছবি, ভিডিও কিংবা শব্দকে ডিপফেক বলা হয়। এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সবসময় চোখে দেখে এটি শনাক্ত করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ভুয়া ছবি ও ভিডিও তত বেশি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠছে। ফলে কারো নামে একটি ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে পারে। এর কারণে একজন মানুষের সামাজিক সম্মান, পারিবারিক সম্পর্ক, শিক্ষা, চাকরি কিংবা পেশাগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও নিয়ে কৃত্রিমভাবে তৈরি বা পরিবর্তিত বিষয় ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব আরো ভয়াবহ হতে পারে।

একটি ছবি সত্য, কিন্তু গল্পটি মিথ্যা

ডিজিটাল বিভ্রান্তির অন্যতম বড় কৌশল হলো সত্যিকারের ছবি ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো। একটি ছবি হয়তো পাঁচ বছর আগে কোনো জায়গায় তোলা হয়েছিল। সেটিকেই বর্তমান কোনো ঘটনার ছবি হিসেবে প্রচার করা হলো। ছবিটি আসল, কিন্তু ছবির সঙ্গে দেওয়া তথ্য মিথ্যা। একইভাবে একটি দীর্ঘ ভিডিও থেকে কয়েক সেকেন্ডের অংশ কেটে এমনভাবে প্রকাশ করা হতে পারে, যাতে ঘটনার সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ দাঁড়ায়। তাই কোনো ছবি বা ভিডিও দেখলেই বিশ্বাস না করে জানতে হবে, এটি কখন, কোথায় এবং কোন ঘটনার সময় ধারণ করা হয়েছিল।

অভিযোগ আর অপরাধ এক নয়

কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে, তদন্ত হতে পারে, মামলা হতে পারে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। বিশেষ করে অপরাধের সংবাদে অভিযুক্ত, অভিযোগ, তদন্ত এবং প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য কখনো আদালতের রায়ের বিকল্প হতে পারে না।

একটি ভুল তথ্য, একটি বাস্তব জীবন

মিথ্যা তথ্যের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় যখন সেটি কোনো বাস্তব মানুষের জীবনে আঘাত করে। কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে তার সামাজিক সম্মান নষ্ট হতে পারে। পরিবারে সমস্যা তৈরি হতে পারে। চাকরি, ব্যবসা বা পেশাগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনলাইনে লাগাতার অপমান, হুমকি ও হয়রানির কারণে কেউ তীব্র মানসিক সংকটেও পড়তে পারেন। গুরুতর পরিস্থিতিতে আত্মহানির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই অনলাইনে কাউকে অপমান করা বা যাচাইহীন তথ্য ছড়ানোকে নিছক মজা হিসেবে দেখা উচিত নয়। কেউ এমন সংকটে পড়লে তাকে একা না রেখে পরিবার, বিশ্বস্ত মানুষ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।

ভুল তথ্য মুছে ফেললেই কি ক্ষতি শেষ

একটি ভুয়া পোস্ট পরে মুছে ফেলা হলেও ক্ষতি সবসময় শেষ হয় না। এরই মধ্যে কেউ ছবি সংরক্ষণ করতে পারেন, ভিডিও ডাউনলোড করে রাখতে পারেন কিংবা অন্য মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিতে পারেন। ফলে একটি মিথ্যা তথ্যের বিস্তার মূল পোস্টের জীবনকাল ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর সংশোধন করা যেমন জরুরি, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রকাশ বা শেয়ারের আগে সেটি যাচাই করা।

ফ্যাক্টচেক কেন জরুরি

গুজব ও মিডিয়া ট্রায়াল ঠেকাতে তথ্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য দেখলেই জানতে হবে, এর মূল উৎস কোথায়, কখন প্রকাশিত হয়েছে, ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে এবং অন্য নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে একই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না। ছবির ক্ষেত্রে বিপরীত ছবি অনুসন্ধান করা যেতে পারে। ভিডিওর মূল উৎস খুঁজে দেখা যায়। বক্তব্যের পূর্ণ ভিডিও বা মূল নথি পাওয়া যায় কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো একটি যাচাই পদ্ধতির ফলকে চূড়ান্ত ধরে না নিয়ে একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎসের তথ্য মিলিয়ে দেখা নিরাপদ।

সাংবাদিকতার দায়িত্ব

ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুততার সঙ্গে নির্ভুলতা বজায় রাখা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পোস্ট ভাইরাল হয়েছে বলেই সেটিকে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়। ভাইরাল পোস্ট অনুসন্ধানের সূত্র হতে পারে, কিন্তু সেটিই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য, নথি ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্র যাচাই করা প্রয়োজন। শিরোনামেও অতিরঞ্জন এড়িয়ে চলা জরুরি। কারণ অনেক পাঠক পুরো সংবাদ না পড়ে শুধু শিরোনাম দেখেই ধারণা তৈরি করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন