বাইপাসেই চিকিৎসা শেষ নয়

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ

বাইপাসেই চিকিৎসা শেষ নয়

দেশ বর্তমানে অসংক্রামক রোগের (NCD) এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মৃত্যুর প্রায় ৬৭ শতাংশই ঘটে অসংক্রামক রোগের কারণে। এর মধ্যে এককভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী হৃদরোগ। প্রতিবছর আনুমানিক চার লক্ষাধিক মানুষ নতুন করে ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজে আক্রান্ত হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, কর্মক্ষম জীবনের মূল্যবান বছর হারানোর (DALYs) ক্ষেত্রেও হৃদরোগের অবদান প্রায় ১৩ শতাংশ। গত এক দশকে বাংলাদেশে তীব্র হৃদরোগের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে রিং পরানো (Angioplasty), বাইপাস সার্জারি (CABG) কিংবা উন্নত ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে বহু রোগীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু একটি বড় বাস্তবতা হলো—চিকিৎসার এই ধাপেই অধিকাংশ রোগীর যত্ন থেমে যায়। অথচ হার্ট অ্যাটাক বা অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন (Cardiac Rehabilitation)।

কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন হলো চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি সমন্বিত পুনর্বাসন প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য রোগীকে নিরাপদে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতের হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কার্ডিয়াক রিহ্যাবে অংশগ্রহণ করলে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে এবং আবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি ২২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। এই পুনর্বাসন ব্যবস্থার চারটি প্রধান ভিত্তি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রথমত, পরিকল্পিত শারীরিক ব্যায়াম। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ ব্যায়াম হার্টের পেশিকে শক্তিশালী করে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ায়।

দ্বিতীয়ত, সুষম খাদ্য ও পুষ্টি পরামর্শ। আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ পর্যাপ্ত ফলমূল ও শাকসবজি খান না, আবার অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের প্রবণতাও উদ্বেগজনক। ফলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং ধূমপানের মতো ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ না করলে আবার হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা থেকে যায়।

চতুর্থত, মানসিক ও সামাজিক সহায়তা। হার্ট অ্যাটাকের পর অনেক রোগী উদ্বেগ, ভয় ও বিষণ্ণতায় ভোগেন। যথাযথ কাউন্সেলিং ও পরিবারভিত্তিক সহায়তা তাদের মানসিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন এখনো অত্যন্ত সীমিত। প্রয়োজনের তুলনায় দেশে এ ধরনের কেন্দ্রের সংখ্যা নগণ্য। রাজধানী ঢাকার কয়েকটি বড় হাসপাতাল ছাড়া দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে এই সেবা প্রায় অনুপস্থিত। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগী এই গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-পরবর্তী সেবার বাইরে থেকে যান। এই ঘাটতির পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় কারণ। প্রথমত, আর্থিক সীমাবদ্ধতা—কারণ অধিকাংশ চিকিৎসা ব্যয় রোগীকেই বহন করতে হয়। দ্বিতীয়ত, হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্রের সময় রিহ্যাবিলিটেশনের জন্য পর্যাপ্ত রেফারেল দেওয়া হয় না। তৃতীয়ত, গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের জন্য দূরত্ব ও যাতায়াত বড় বাধা। তবে আশার কথা হলো, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এই সংকট নিরসনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। টেলিমেডিসিন, ভিডিও কল, মোবাইল অ্যাপ এবং ঘরে বসে পরিচালিত ‘হোম-বেইজড কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন’ এখন কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। বাংলাদেশেও ‘বাংলা হার্ট ম্যানুয়াল’-এর মতো উদ্যোগ এই সেবাকে সহজলভ্য করতে পারে। আজ সময় এসেছে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশনকে একটি বিলাসী বা ঐচ্ছিক সেবা হিসেবে না দেখে, বরং হৃদরোগ চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করার। কারণ হার্টে রিং বসানো বা বাইপাস করা জীবন বাঁচাতে পারে, কিন্তু রোগীকে পূর্ণ সুস্থ, কর্মক্ষম ও নিরাপদ জীবনে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পালন করে কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন। অস্ত্রোপচারেই চিকিৎসার সমাপ্তি নয়; বরং সেখান থেকেই শুরু হয় সুস্থ জীবনের নতুন অধ্যায়।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (কার্ডিওলজি), শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...