ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তে চিকিৎসাধীন রোগী ও স্বজনরা চরম বিপাকে ও ভোগান্তি পড়েছেন। তাদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং বিক্ষোভ করেছেন। আবার ভর্তি রোগীদের অনেকেই হাসপাতাল ছাড়তে শুরু করেছেন। তবে নতুন কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার (১২ জুন) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরেজমিনে এ দৃশ্য দেখা গেছে। জুমার নামাজের পর এনআইসিইউতে ভর্তি থাকা কয়েকজন নবজাতকের মা-বাবা ও স্বজনরা নিচে নেমে সাংবাদিক সামনে বিক্ষোভ করেন। এসময় তারা চিকিৎসাসেবার কথা বিবেচনায় নিয়ে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পূর্ণবিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
মো. রাসেল নামের একজন আমার দেশকে বলেন, চারদিন আগে এই হাসপাতালে আমার স্ত্রীর সিজারে দুই সন্তানে জন্ম হয়। জন্মের পর থেকে এনআইসিইউ আছে। এখন এই দুই বাচ্চাকে নিয়ে আমি কোথায় যাবো। এই অবস্থায় বাচ্চাদের সরানো তো আরো রিস্ক। হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণার পর থেকেই টেনশনে আছি। কি করবো, কোথায় যাবো কিছুই মাথায় আসছে না।
মো. শরীফ নামের আরেকজন আমার দেশকে বলেন, আমার বাচ্চা ১০ দিন ধরে এনআইসিইউ ভর্তি। অক্সিজেন চলছে। শ্বাসকষ্টের বাচ্চার অক্সিজেন লেভেল কম। এই অবস্থায় কোথাও স্থানান্তর হলে বাচ্চার যদি কিছু হয়, তাহলে দায়ভার কে নেবে।
চিকিৎসাধীন অনেক রোগী ও স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের অন্য বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা বেশ ভালো। খরচও তুলনামূলক কম। তাই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পূর্ণবিবেচনার দাবি করছি।
রোগী ও স্বজনরা জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মারা যাওয়া নবজাতকদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে একটি সমঝোতায় এসেছে ইতোমধ্যে। ওই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি এমন অনাচার করা সরকারের ঠিক হয়নি। তবে শুক্রবার বেশ কিছু রোগীদের হাসপাতাল ছাড়তে দেখা গেছে। তবে আইসিইউ, এনআইসিইউ, এইচডিইউ ও সিসিইউয়ে চিকিৎসাধীন ক্রিটিক্যাল রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ২৪৩ জন সাধারণ রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে এনআইসিইউতে ৫০ নবজাতক, আইসিইউতে ১৩ জন এবং সিসিইউতে ৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন। এর আগের দিন ৪৩১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিল। লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণার পরপরই বৃহস্পতিবার বিকালে নিরাপত্তার জন্য হাসপাতাল ঘিরে মোতায়েন করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর সদস্যদের। কিন্তু আজ শুক্রবার তা দেখা যায়নি। এছাড়াও লাইসেন্স বাতিলের পর থেকে হাসপাতালটিতে নতুন করে কোনো রোগীকে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়নি।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তকে পুনর্বিবেচনার আবেদন করবে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার দুপুরে হাসপাতালটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল মগবাজার শাখার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে তা আমরা সঠিকভাবে পালন করবো। এক্ষেত্রে রোগীদের কোনো প্রকার ক্ষতি যে না হয়; সে বিষয়ে আমরা খেয়াল রাখছি এবং খেয়াল রাখবো, ইনশাআল্লাহ।
হাসপাতালটির পরিচালক বলেন, সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা পুনর্বিবেচনার জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করবো। আশা করবো- জনগণের কথা বিবেচনা করে সরকার জনস্বার্থে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান রাখতে আমাদের অনুমতি দেবেন।
তিনি আরও বলেন, আমাদের যে ওয়ার্ডে যে ছয়টি শিশু মৃত্যুবরণ করেছে; সেই ওয়ার্ড আমরা বন্ধ রেখেছি। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি- আগামী তিন মাসের মধ্যে সেই ওয়ার্ডের সব ধরনের সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করবো।
ঈদুল আজহার আগের দিন গত ২৭ মে ভোরে আদ-দ্বীন হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ঘটনার দিনই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে শোকজ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালকে দেওয়া শোকজ নোটিশের জবাব কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক না হওয়ার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর হাসপাতাল থেকে রোগী স্থানান্তরের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়া হয়। এরপর থেকেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীরা অন্যত্র যাওয়া শুরু করে।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

