রাজনৈতিক গণতন্ত্র সফল করতে অর্থনীতিরও গণতন্ত্রায়ণ জরুরি: আমির খসরু

রাজনৈতিক গণতন্ত্র সফল করতে অর্থনীতিরও গণতন্ত্রায়ণ জরুরি: আমির খসরু
বুয়েটে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণ’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী। ছবি: আমার দেশ

দেশের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রবণতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। দেশের সবকিছুর আগে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।

রোববার বিকেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণ অনুষ্ঠান-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, দেশের স্বার্থ বিক্রি করে ক্ষমতায় টিকে থাকার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তা একপর্যায়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তৈরি করেছে। এ কারণেই সরকারের অন্যতম স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই- এই চিন্তা থেকেই এ স্লোগান দেওয়া হয়েছে।

নিজের জেলজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, ‘৫ তারিখে আমি তখন জেলখানায়। এর আগে বহুবার জেলে গিয়েছি, জেল থেকে বের হয়েছি। কিন্তু এবার যখন জুলাইয়ে জেলে নিয়ে গেল, আমার কাছে মনে হয়েছিল, আমার আর বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

তিনি জানান, সে সময় তার বিরুদ্ধে পুলিশ হত্যা ও বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) কেন্দ্রে আগুন দেওয়ার মতো মামলা দেওয়া হয়েছিল। কারাগারে থাকার সময় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না পাওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাব এবং বন্দিদের ওপর কঠোরতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

জুলাইয়ের শেষ পর্যায়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করে আমির খসরু বলেন, কারাগারে থাকা অবস্থায় বাইরে কী ঘটছে, সে বিষয়ে তারা কোনো তথ্য পাচ্ছিলেন না। পরে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন- এমন খবর পাওয়ার পর কারাগারে থাকা হাজারো বন্দির মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে গেছে উল্লেখ করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এখন মানুষের ভোটাধিকার, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। এত মানুষের ত্যাগ ও আত্মত্যাগের পর দেশের মানুষ যে পর্যায়ে এসেছে, সেখানে তাদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী হওয়াটাই স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, শুধু রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করলেই হবে না; মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার ও অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক গণতন্ত্র সফল করতে হলে অর্থনীতিরও গণতন্ত্রায়ণ করতে হবে।

অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, কামার, কুমার, তাঁতি, কুটিরশিল্পী, শিল্পী, অভিনেতা, গায়ক ও ক্রীড়াবিদসহ অর্থনীতির বাইরে থাকা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে মূলধারায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, শুধু তাদের দক্ষতা থাকলেই হবে না। দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি আধুনিক ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের উৎপাদিত পণ্য ও সৃষ্টিশীল কাজের জন্য বিক্রির প্ল্যাটফর্‌ম তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ ও ‘স্পোর্টস ইকোনমি’র ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি। তার মতে, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো অর্থনীতির মূল স্রোতের বাইরে রয়েছে। তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সামাজিক কর্মসূচির কথা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করেই এসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোয় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এসব উদ্যোগের লক্ষ্য।

ইশতেহার ও ৩১ দফা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সার্থকতা আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, ‘জুলাই কোনো ব্যক্তির নাম নয়, কোনো দলের নাম নয়। এই জুলাই আমাদের বাংলাদেশের সবার অর্জন।’

তিনি বলেন, আজকে একটি রাজনৈতিক দল, দুই-একটি রাজনৈতিক দল কথায় কথায় শুধু জুলাই নিয়ে ব্যবসা করছে। আমরা এই ব্যবসা থেকে দূরে সরে আসতে চাই।

জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে আগামীর বাংলাদেশ গড়তে বর্তমান সরকার কাজ করছে জানিয়ে আমিনুল হক বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমরা বিশ্বাস করি একটি সহনশীল, ধৈর্যশীল ও সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে।’

অনুষ্ঠানে বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একরামুল হক, উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম, সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন